সবুজ অরণ্যঘেরা পাহাড় দেখে আমারা পুলকিত হই, মেঘের মিতালি দেখে হই বিমোহিত। আর যখন মেঘ আর সবুজ অরণ্য ঘেরা পাহাড়ে চোখে পড়ে ছোট্ট একটি ঘর একাকি দাঁড়িয়ে, তখন ভাবনা আর ভাললাগার মাত্রাটি বৃদ্ধি পেয়ে যায় বহুগুণ। অজান্তেই আকাঙ্ক্ষা জাগে মনে – আহ! যদি একবার স্পর্শ করতে পারতাম, থাকতে পারতাম এই স্বর্গে।
পাহাড়ে যারা ঘুরে বেড়াই তাদের কাছে এই ছোট্ট ঘরটি খুব পরিচিত । সাধারণের কাছে যা জুমঘর নামেই পরিচিত। বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে জুমচাষই হচ্ছে কৃষির অন্যতম জনপ্রিয় পদ্ধতি। বলা যায় একমাত্র কৃষি ব্যবস্থাপনা যা স্থানীয় পাহাড়িদের বছরব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়ে থাকে এবং আয়ের প্রধানতম উৎস। পাহাড়ের ঢালে বহুমাত্রিক বীজ বপণের মাধ্যমে চাষাবাদের নামই জুমচাষ। পর্যায়ক্রমে জুমের ফসল উৎপন্ন ও সংগ্রহ করা হয়। সেজন্য জুমের রক্ষণাবেক্ষনের জন্য যে অস্থায়ী ঘর তৈরি করা হয় সেটাই আমাদের কাছে জুমঘর। জুমঘর কখনই সৌন্দর্য অবলোকন করার জন্য তৈরি হয় না।
পাহাড়িদের কাছে এর বহুমাত্রিক ব্যবহার আছে । এমনকি পর্যটক, অভিযাত্রীদের কাছেও। যারা পার্বত্য অঞ্চলের গহীনে ভ্রমণ করেছেন আরও বিশেষভাবে বলতে গেলে হাল সময়ের ট্রেইল/অফট্রেইলে ঘুরাঘুরি করেন বা করেছেন তাদের কাছে জুমঘর পান্থশালা হিসেবে জীবনে একবার হলেও উপস্থিত হয়েছে। যারা আরও দুঃসাহসী রাতের আঁধারকে জয় করে অচেনা পথের অভিযাত্রী হয়ে হেঁটেছেন পাহাড়ের পথে, তাদের কাছে জুমঘরের স্মৃতি বিশেষ একটা জায়গা দখল করে আছে। সাধারণ ভ্রমণকারীদের কাছে জলপান ও ক্ষণিক বিশ্রাম এবং ফ্রেমে বন্দী হওয়ার অন্যতম স্থান জুম ও জুমঘর।
জুম ও জুমঘর অধিকাংশের কাছে এভাবেই ধরা দেয়। কিন্তু জুম ও জুমঘরের সাথে ঐতিহ্য, প্রথা, বিশ্বাস, উৎসব, আচার-অনুষ্ঠান, জীবন-জীবিকা, হাসি-কান্না, স্বপ্ন ও লড়াইয়ের এক ভিন্ন চিত্র চিত্রিত হয়। যা আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। সেই সাথে হাজার বছরের এই কৃষি পদ্ধতিটির কিছু নেতিবাচক দিকও আছে। বাংলাদেশের পাহাড় পর্বতময় অঞ্চল খুব সীমিত । তিন পার্বত্য জেলা, চট্টগ্রাম জেলা, বৃহত্তর ময়মনসিংহ, সিলেটের কিছু অংশ উল্লেযোগ্য। এর বাহিরে কুমিল্লার কিছু জায়গা নামেমাত্র পাহাড় হিসেবে পরিচিত। এদের ভিতর শুধুমাত্র পার্বত্য তিন জেলাতেই জুমচাষের অধীক দেখা মেলে। সিলেটে স্বল্প পরিমাণে জুমচাষ হয়। ময়মনসিংহ অঞ্চলের গারো পাহাড়ে (মান্দি) গারো ও হাজং এবং শ্রীপুর, কুলাউড়া ও মৌলভীবাজার সীমান্তের খাসিয়া পাহাড়ে খাসিয়ারাও জুমে আবাদ করতেন।
কিন্তু বৃটিশ শাসনামলে বন বিভাগ গারো পাহাড় এবং মধুপুর-গাজীপুর ভাওয়াল গড় এলাকার প্রাকৃতিক বনাঞ্চলকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা দিয়ে নিষিদ্ধ করে জুম চাষ। বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে গারো ও হাজংরা দারিদ্রতার সাথে লড়াই করে মুষ্টিমেয় পরিবার সমতলের অধিবাসীদের মতই কৃষিকাজে অভ্যস্ত হয়েছে নয়তো অন্যপেশা গ্রহণ করেছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তাই জুমচাষ অপরিচিত। বনভূমি বলতে যা তা কেবল রোপণকৃত বৃক্ষ। পাহাড়ি এলাকায় প্রাকৃতিক বন প্রায় বৃক্ষশূন্য। নামেমাত্র টিকে আছে মধুপুর আর ভাওয়াল গড়। সিলেটেও একই সময়ে জুম নিষিদ্ধ হয় খাসিয়াদের জন্য।

বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির ১১ টি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সকলেই কমবেশি জুমচাষের উপর নির্ভরশীল। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় ৯০ শতাংশ পাহাড়িই জুম চাষী। জুমই তাদের জীবন জীবিকার প্রধান উৎস। জুমচাষকে Swidden Cultivation, Shifting Cultivation, Slash and Burn Agriculture ইত্যাদি নামেও ডাকা হয়। জুমচাষের বেশকিছু ধাপ থাকে। তার ভেতর প্রথম ধাপটি হচ্ছে জমি নির্বাচন করা। একটি পাহাড়ে ১/৩ বছর টানা জুম করা হয়। তারপর সেই পাহাড়টিকে আবার পতিত ফেলে রাখতে হয় তার উর্বরা শক্তি ফিরে পাওয়ার জন্য এবং নতুন একটি পাহাড়কে আবার জুমচাষের উপযোগী করে তৈরি করতে হয়। এই প্রক্রিয়াটিতে পাহাড়ের ঝোপ-ঝাড় পরিস্কার করে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।
সাধারণত শীতের শেষে চাষের উপযুক্ত পাহাড় বেছে নিয়ে তার ঝোপ-জঙ্গল কেটে পরিস্কার করা হয়। কেটে রাখা জঙ্গল শুকিয়ে আসলে তাতে বিশেষ প্রক্রিয়ায় দেয়া হয় আগুন। ফ্লাগুন-চৈত্র মাসেই প্রধানত আগুন দেয়ার কাজ শুরু হয়। অনেকে বৈশাখের অনুষ্ঠান শেষ করে আগুন দেয়া শুরু করেন। আগুনে জঙ্গল পোড়ে তৈরি হয় ছাইয়ের স্তূপ। তারপর অপেক্ষায় থাকতে হয় বৃষ্টির। বৃষ্টি হলে শুরু হয় বীজ রোপণের পালা। ভাদ্র-আশ্বিন মাসে জুমের ফসল বড় হয়ে ওঠে তখন ফসল রক্ষার জন্য তৈরি করা হয় জুমঘর। জুমঘর একটি অস্থায়ী নিবাস, প্রাথমিক শষ্য ভান্ডার, শষ্য মাড়াইয়ের স্থান, নিরাপত্তা চৌকি ও বিনোদনেরও কাজেও লাগে।
যে সকল পরিবারের পাড়া (পাহাড়ি গ্রামকে পাড়া বলে) জুম থেকে বেশ দূরে তারা এই সময়টাতে জুমঘরেই পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করেন। ফসল তোলা শেষ করে ফিরে আসেন স্থায়ী বাড়িতে। জুমের ফসল হয় পর্যায়ক্রমে। প্রথমে জুন-জুলাই (আষাঢ়-শ্রাবণ) মাসের দিকে মারফা (কাঁকুড় জাতীয় ফল)। জুলাই-আগস্ট মাসে তোলা হয় ভুট্টা আর সেপ্টেম্বর- অক্টোবর মাসের দিকে ধান তোলার কাজ শুরু হয়।

জুমঘর নির্মাণ করা হয় মাটি থেকে বেশ কিছুটা উপরে। নির্মাণের প্রধান উপকরণ বাঁশ। সাধারণত জুমের উপরের অংশে কোন বড় গাছের কাছে তৈরি করা হয় যাতে করে সমস্ত জুমক্ষেতটি খুব সহজেই নজরে আসে। জুমঘর ছোট বা মাঝারি আকারের হয়ে থাকে। সাধারণত এক কক্ষ বিশিষ্ট তবে শষ্য সংরক্ষণের জন্য অনেকে দুই কক্ষের ঘরও তৈরি করেন। প্রতিটি জুমঘরে খোলা প্রশস্ত একটা অংশ থাকে যা মূল ঘর থেকে সামনের দিকে প্রসারিত মাচাং বিশেষ। এটির তিন দিক উন্মোক্ত আর একদিকে মূলঘরটি থাকে। কোন কোন জুমঘরের দুই পাশেও এই মাচাংটি দেখা যায়। সচরাচর মাচাংটির পূর্ব ও পশ্চিম দিকে কোন আড় রাখা হয়না, কেননা এই অংশটি শষ্য শুকানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। মাচাংয়ের প্রান্ত বরাবর বাঁশ লাগানো থাকে যেখানে ভূট্টা জাতীয় শষ্যগুলো ঝুলিয়ে শুকানো হয় এবং দৈনন্দিন কাজেও ব্যবহার করা যায়।
জুমঘরের উচ্চতা খুব একটা বেশি হয় না। কারণ পাহাড়ের উপর তীব্র বাতাসের সাথে লাড়াই করে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। জুমঘরের ছাঁদ হয় দু চালা এবং বাতাস প্রবাহের দিক বুঝে সেই দিকে ছাঁদটিও বেশি ঢালু রাখা হয়। যাতে করে বাতাস বাধা প্রাপ্ত না হয়। একচালা জুমঘর খুবই কম দেখা যায়। প্রতিটি জুমঘরের নিচে মাটি গর্ত করে চুলা বানানো থাকে। এটি রান্নার কাজের পাশাপাশি জুমঘরটিওে গরম রাখতে সহায়তা করে। জুমঘরের ছাঁদটি শন ও বাঁশ দিয়েই নির্মাণ করা হয় তবে ইদানিং কিছু জুমঘরে টিন ব্যবহার করতেও দেখা যায়। অনেকে জুমঘরের আশপাশে ফুলের গাছ লাগান। জুমঘরে কোন জানালা থাকে না। সাধারণত উত্তর-দক্ষিণে দুইটি দরজা থাকে। তবে এক দরজার জুমঘরও দেখা যায়। জুমঘরের নীচে যাতে পানি না জমে তার জন্য নালা তৈরি করা হয় এবং বৃষ্টির পানি ছাঁদ বেয়ে সেই নালায় পরে জুম চলে যায়।
যে জুম আর জুমঘর আমাদের প্রশান্তির পরশ ও দৃষ্টির খিদে মিটায়, তার পিছনে থাকে পাহাড়ি প্রতিটি নর-নারীর হাড়ভাঙা খাটুনি। বমদের সাথে অধিক সময় কাটানোর সুবাদে তাদের বেশ কিছু জুম কেন্দ্রিক কাজ-কর্ম ও আচার অনুষ্ঠান দেখার সৌভাগ্য হয় আমার। চমৎকার সব শব্দ ব্যবহার করেন তারা। তার ভিতর আছে, যে দিন জুমে প্রথম বীজ বোনা শুরু হয় সেদিনটিকে বম’রা বলেন ‘কুইতুহ’ আর তাদের ভাষায় জুমঘর হচ্ছে থ্লাম (Thalm) । জুমে বীজ বোনার জন্য যে দ্যা ব্যবহার করেন সেটাকে বলেন ‘নামতাং’। ফসল সংগ্রহ ও পরিবহনের জন্য যে ঝুড়িটি ব্যবহার করেন সেটাকে বলেন ‘স্যাই’। আর ফসল তোলার নবান্ন কে বলে থাকেন ‘থলাইথার’। বমেরা যেসব সামগ্রী উৎপাদন করে তাদের মাঝে আছে কোয়াল মুম (ভুট্টা), চংমা (মারফা), মাইসেন (মিষ্টি কুমড়া), মাইপল (জালি কুমড়া/সাদা কুমড়া), আইথিং (আদা), আইয়েং (হলুদ), বালয় (শিম), মারসিয়া (মরিচ), ফাং (ধান), বা (কচু), লা (তুলা) ইত্যাদি। এছাড়া কাচআলু নামে একটা আলু হয় যা মিষ্টি আলুর মতো স্বাদ। দেখতে দন্ডাকার । শীতের সকালে জলখাবারের মতই আগুনে গা গরম করতে করতে সেই আগুনেই পুড়িয়ে কাচআলু খাওয়ার আলাদা একটা আমেজ আছে।

অতীতে এমনকি এখনও কোন কোন পাড়ার বম’রা ‘জুম মঙ্গল পূজা’ করেন। তারা বলেন ‘লৌ থিং কুং বল’। এই পূজাটি হয় জুম দেবতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। বমেরা বিশ্বাস করেন যে জুম তাদের বছরব্যাপী খাদ্যের যোগান দেয়, তার অবহেলা করলে অমঙ্গল হয়। কেননা জুমের আত্মা তিন বছর জুম মালিকের পিছু ছাড়ে না । জুম মঙ্গল পূজার আগের দিন পরিবারের মেয়েরা পিঠা তৈরি করেন (সাধারণত বিন্নী ধানের) আর খুব ভোরে সারা পথে চালের গুড়া ছিটাতে ছিটাতে পুরুষরা জুমে চলে যান। জুম কাটার দিন একটি পাথরকে গাছের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়। সেই পাথরটিকে পূজার দিন খুঁজে বের করতে হয়।
পাথরটি খুঁজে পাওয়া মাত্রই সকলেই চিৎকার দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন এবং জুমের মাটি কপালে মাখেন। তারপর পাথরটিকে জুম আলুর কোন গর্তের পাশে পুঁতে তার সাথে একটি মারফা ও একটি বাঁশের চোঙ্গাও স্থাপন করা হয়। এরপর সেই পাথরের উপর চালের গুড়া ছিটিয়ে মোরগ বা শূকর বলি দেয়া হয়। বলি দেয়া প্রাণীর মাংস পূজার ডালায় সাজিয়ে মন্ত্র পড়া হয়। পাথরটিকে ঘিরে চারিদিকে বাঁশের বেড়া দেয়া হয় এবং তাতে ফুল, কলা পাতা ও মোরগের পালক দিয়ে সাজিয়ে তার ভিতর কলা পাতায় রান্না করা মাংস, তরিতরকারি ইত্যাদি উৎস্বর্গ করা হয়। পূজার পরের দিন জুমের মালিকের জুমে যাওয়া নিষেধ।
এছাড়া বৃষ্টির জন্য ‘রুয়া খা জার’ অনুষ্ঠানের রেওয়াজ এখনও দেখা যায়। অধীকাংশ পূজায় বলির প্রথা থাকলেও ‘রুয়া খা জার’ জন্য তার প্রয়োজন হয় না। এই পূজার কোন নির্দিষ্ট সময়ও নির্ধারিত নেই। জুম পরিস্কারের পর যে কোন দিন এই পূজা হতে পারে। সকলে মিলে সেই দিনটি ঠিক কেরে নেন। এই পূজার তেমন কোন আনুষ্ঠানিকতা নেই। দৈনন্দিন কাজের মতোই মেয়েরা ভোরে পানি আনতে যায়। তবে খুব সাবধানে পানি আনতে হয়। কারণ যার পিঠ ভিজে যায় এবং পথে পানি ফেলে পথ পিছল করেন তার অনেক দুর্নাম হয়। পুরুষরা বাড়ির পাশের জঙ্গল পরিস্কার করেন, মাচাং ঘরের নীচের ময়লা পরিস্কার করেন এবং বৃষ্টির পানি যাতে ঘরের নীচ দিয়ে না যায় তার জন্য নালা তৈরি করেন। এছাড়া ঘরের সিঁড়ি এবং অন্যান্য জায়গা মেরামত করে থাকেন। মূলত বছরে একবার সবাই মিলে নিজের ও গ্রামের পরিস্কার ও গোছগাছের একটা মহড়া দিয়ে থাকেন।
তবে খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরীত হবার পর এসবের জন্য অধীকাংশ বমই চার্চের রীতি-রেওয়াজে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেছেন। হাজার বছরের এই অনুষ্ঠান-আচার গুলো তাই এখন অনিয়মিত হতে হতে বিলীন হবার পথে।
জুমচাষের একটি বিশেষত্ব হচ্ছে-সব ফসল তোলে নেয়ার পর আপনা থেকেই কিছু ফসল হতে থাকে সেটাকে বম’রা বলেন ‘লওচুল’। এমনিতে ‘রান্যা’ শব্দটি আমাদের কাছে বেশি পরিচিত। তাছাড়া মারমা’রা বলেন-‘পুঙঃছো’। প্রতিটি জাতিসত্তার মানুষদের জুম কেন্দ্রীক স্বতন্ত্র আচার-অনুষ্ঠান রয়েছে। হাজার বছর ধরে পূর্ব পুরুষ থেকে মেনে আশা বিশ্বাস ও নিয়ম জাতি ও গোত্র ভেদে ভিন্ন ভিন্ন হবে এটাই স্বাভাবিক। মারমা’রা জুমের জমি নির্বাচনের জন্য বিশেষ একটি প্রক্রিয়া গ্রহণ করে থাকেন। সাক ও ম্রোদেরও বিশেষ কিছু পূজা রয়েছে। শহরঘেঁষা পাহাড়িরা এসব আচার-অনুষ্ঠান থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। মারমা’রা জুমের জন্য পরীক্ষামূলক পাহাড় নির্বাচন করে থাকেন। তারপর ঝোপ-ঝাড় কেটে একটি স্থান পরিস্কার করে বাঁশ দিয়ে মঞ্চের মতো একটা কাঠামো তৈরি করেন। মাটির দুইটি ঢেলা সেই কাঠামোটির উপর রেখে দেবতার উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করা হয়।
এরপর জুম থেকে এক টুকরো মাটির গোলক নিয়ে রাতে ঘুমানোর সময় বালিশের নিচে রেখে দেয়া হয়। স্বপ্নে যদি বাড়ির কর্তা মাছ, দুধ, মাংস ইত্যাদি দিয়ে ভাত খাওয়া স্বপ্ন দেখেন তাহলে শুভ বলে বিবেচনা করা হয় এবং জমিটি জুমের জন্য নির্বাচিত হয়। আর যদি স্বপ্নে চুলকাটা, ঠাট্ট-তামাশা, সাদা পোষাক পরার কোন দৃশ্য দেখা যায় তবে অমঙ্গল ও অশুভ চিহ্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং জমিটিতে সে বছর চাষাবাদ করা হয় না। নতুন কোন স্থানের খোঁজ করতে হয়। মারমা’রা জুমঘরকে ‘বক্’ বলে থাকেন। ধান তোলার আগে ‘অবংমা’ পূজার রেওয়াজ আছে মারমাদের মাঝে। এই অনুষ্ঠানটি গ্রাম প্রধান (কারবারি) দ্বারা পরিচালিত হয়। মূলত এটি একটি ভোজ উৎসব। সমাজের অভিজাত মানুষদের নিমন্ত্রন করা হয়। বাঁশের মাচায় কলা পাতা বিছিয়ে তার উপর চাল এবং মাচার উপর থেকে সুতা দিয়ে একটা কাঁকড়া ঝুলানো থাকে।
একটা শূকর বেঁধে রাখা হয় সেখানে। অন্য একটি মাচায় একটি পাত্রে মুরগির বাচ্চার রক্ত, দুইটি ডিম, এক বোতল মদ, বিভিন্ন জাতের ধান, একটি সিদ্ধ করা মুরগির বাচ্চা, এক বান্ডিল সুতা, কিছু সিদ্ধ শাক–সবজি, পানি, এক থালা ভাত, সিদ্ধ চিংড়ি, তিনটি কাচা মরিচ ও দুটি রৌপ্য মুদ্রা রাখা হয়। এসকল দ্রব্যাদি পানি দিয়ে ধুয়ে দেয়া হয়। তারপর উপস্থিত সবাই ঐ মাচার কাছে প্রার্থনা করেন। তারপর মাচাটি তুলে ধান ক্ষেতের পূর্ব নির্ধারিত জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় শূকরটিকেও নিয়ে যাওয়া হয় এবং তখন প্রত্যেকে মাচাটিকে অনুসরন করেন। তারপর পুরোহিত কিছু মন্ত্র পড়ে থাকেন। শূকরটিকে বধ করে তার মাংস রান্না করা হয় এবং সকলে ভাত, মাংস ও মদ খেয়ে উৎসব করেন।
সাক’রা জুমের জন্য নির্ধারিত জমিটি ভাল না খারাপ তা সিদ্ধ ডিম দেখে নির্ণয় করে থাকেন। জমি নির্ধারণের পর বাঁশ কেটে তার মাথায় ক্রস দিয়ে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বাঁশটি পুঁতে রাখেন। তারপর শুভদিন দেখে দেবতার উদ্দেশ্যে সিদ্ধ ডিম দেখে স্থানটি নির্বাচন করেন। এই অনুষ্ঠানটিকে সাক’রা বলেন ‘উসাইন’ খাওয়া। অনুষ্ঠানটি মোটামোটি এরকম : পরিবারের কর্তা অন্যান্যদের নিয়ে জুমের কাছাকাছি কোন ঝিরির কাছে উসাইন খাওয়ার স্থান ঠিক করেন। এ সময় তারা অবশ্যই এক জোড়া মোরগ-মুরগি, কাঁচা হলুদ, জুমের আলু, তুলা, একটি ডিম, দ্যা ধারানোর পাথার, সুতা ইত্যাদি সঙ্গে নিয়ে যান।
উসাইন খাবার জন্য যে যায়গাটি ঠিক করেন তার আশপাশে ডাল-পালা ও পাতায় পরিপূর্ণ এবং কান্ডের অগ্রভাগ নিখুঁত এ রকম একটি গাছ বেছে নেয়া হয়। যাকে বলা হয় ‘নাইতপাং’ বা দেবতা গাছ। গাছটির গোড়ায় বাঁশের মাচাংঘর তৈরি করা হয় যাকে বলে ‘নাইতচাং’ বা দেবতা ঘর। এরপর পূজার জন্য নেয়া মোরগ-মুরগি জবাই করে পালক পরিস্কার করা হয় এবং আস্ত মোরগ-মুরগি সেদ্ধ করা হয়। পূজার প্রধান উপকরণ ডিমটিও এসময় সিদ্ধ করা হয়। তারপর অন্যান্য জিনিস ‘দেবতা গাছের’ গোড়ায় সাজিয়ে রাখা হয়। এরপর শুরু হয় পূজা। পূজা শেষে ডিমের খোসা ফেলে সুতা দিয়ে ডিমটিকে সমান দুই খন্ডে কাটা হয়। ডিমের কুসুম দাগ বিহীন ও পরিস্কার হলে শুভ হিসেবে ধারা হয় এবং জুমের জন্য যায়গাটি নির্বাচিত হয়। আরও একটি বিষয় হচ্ছে দ্যা ধারানোর পাথরটিতে মোরগের রক্ত মাখিয়ে সেটি ধারানো হয়। সেই দিনই অল্প হলেও জুমের কিছু যায়গা পরিস্কার করতে হয়। জুম কাটার সময় সাক’রা বাহিরের কোন লোকের সাথে কথা বলেন না। সারা বছর পরিশ্রম করে ফসল ফলানোর পর আসে নবান্ন উৎসব। সাক’রা নবান্ন উৎসবকে বলেন ‘আংনাইবুক পো’।
পাংখোয়াদের জুম সম্পর্কিত কাজগুলোর নামও বেশ আকর্ষনীয় যেমন : জুমচাষকে বলেন ‘লো-নেই’, ‘ফালদার জে’ হচ্ছে জমি নির্বাচন করার একটা রীত বা আচার, ‘লৌ ভাত’ হচ্ছে জুম কাটা, ‘লৌ অর’ হচ্ছে জুমপোড়া, ‘লৌ চু সাক’ হল জুমঘর। তেমনি ‘চিম খং কা হল্ক হল বীজ বোনা, ধান কাটাকে বলেন ‘সাংশিন’ আর ধান মাড়াইকে বলেন ‘সাং রা চিল’ ইত্যাদি।
খিয়াংদেরও জুম কেন্দ্রীক কিছু উৎসব আছে তার ভিতর ‘হেনেই’ হচ্ছে নবান্ন উৎসব। তবে জুমে ধান বোনার পরও করা হয়ে থাকে। তাছাড়া ‘বুগেলে’ হচ্ছে বন্য প্রাণী থেকে জুম রক্ষা করার একটি মজাদার ভোজ উৎসব।
খুমী সমাজেও জুম চাষের সাথে অনেক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান আছে। যে সকল অনুষ্ঠান জুমকে কেন্দ্র করে হয় তার ভিতর : ‘চো-প্ল’ হচ্ছে ধান কাটার পূজা। যাতে করে দেবতা অধিক ফসল পেতে সহায়তা করেন। জুমের আগাছা পরিস্কার এবং আগাছা যাতে কম হয় সেজন্য যে পূজা খুমীরা করে থাকেন তাকে বলেন ‘ল ব’। ‘ল ব’ পূজা শুধু আগাছা নয়, জুমে যাতে কোন রোগ বালাই না হয় তার জন্যও করা হয়ে থাকে। অনেকটা সাকদের মতোই মুরগি ও ডিম দিয়ে এ পূজা করা হয়। এছাড়াও ‘নিশা-জা’ হচ্ছে শুষ্ক মৌসুমে পাড়া বন্ধক পূজা। ‘নিচো-জা’ হচ্ছে আষাঢ়ী পূজা। এই দুইটি পূজা পাড়ার সকলে মিলে করতে হয়। এতে ছাগল, শূকর, মুরগি বলি দেয়া হয়। তখন পাড়া থেকে লোকজন বাহিরে এবং বাহির থেকে পাড়ায় আসা যাওয়া করতে পারে না। ২/৩ দিন ধরে এই উৎসব দুটি হয়। মূলত পাহাড় দেবতাকে তুষ্ট রাখাই এই পূজার মূখ্য উদ্দেশ্য।

ত্রিপুরাদের ‘গরয়া নৃত্য’ জুমচাষ ও জীবন-জীবিকার উপর রচিত বিখ্যাত একটি নাচ। জুম কাটা, জুমে বীজ বোনা, আগাছা পরিস্কার, পশু-পাখি তাড়ানো, ধান কাটা, ধান মাড়াই, ইত্যাদি দৃশ্যকল্প উপস্থাপন করা হয় নাচটিতে।
জুমকে কেন্দ্র করে ম্রো /মুরংদের কিছু কিছু পূজা ও উৎসব রয়েছে। তার ভিতর ‘নিংমা নাইখাং পই’ হচ্ছে বিশ্রাম উৎসব। জুমের ফসল উত্তোলনের পর বিশ্রামের সময় এই উৎসবটি পালন করা হয়। উৎসব চলাকালে দিনে তিনবার উপাসনালয়ে গিয়ে প্রার্থনা করতে হয় এবং জুমে নতুন ফসল উৎসর্গ করা হয় যাতে পরের বছর ভাল ফলন পাওয়া যায়। এছাড়া ‘বতথক খাং’ পূজা জুম শুরু করার আগে বাৎসরিক কাজের শুভ-কামনা করে আয়োজন করা হয়। পূজাটি তিন দিন ধরে বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের ভিতর দিয়ে সম্পন্ন হয়। ‘সিয়াদং খাং’ পূজা বর্ষাকালের পূজা। এটি আয়োজনের কারণ হচ্ছে – জুমের ধান, তুলা, তিশি, বরবটি, ঢ্যারশ, কুমড়া ইত্যাদি ফসল যাতে অকালে ঝরে না পড়ে । এই পূজাটিও তিন দিন ধরে চলে। এতে ১ম দিন পিঠা তৈরি করে মেয়েরা আর পুরুষরা জুম পূজা করতে যান। জুমের মাঝখানে ‘তুর্তুদ’(জুমের মধ্যবর্তী যায়গা যা মুরংরা জুমের হৃদপিন্ড হিসেবে বিশ্বাস করেন) এ একটি, উইয়ের ঢিবি ও ঝিরির জন্য একটি করে মোট তিনটি মোরগ পূজার বেদিতে বলি দেয়া হয়। এটাকে ম্রো’রা বলেন ‘ইয়াউচা’ যার মানে জুম ধুয়া। সবশেষে অন্যান্য উৎসবের মতই ভোজন পর্ব শুরু হয়।
জুমের মূল কাজ সকলের প্রায় একই রকম। সারিবদ্ধভাবে নারী-পুরুষ বীজ বোনার কাজটা শুরু করেন। সাধারণত বীজ নীচ থেকে উপরের দিকে লাগানো হয়। দ্যা দিয়ে গর্ত করে এক সঙ্গে সব ফসলের বীজ সেই গর্তে দিয়ে দেয়া হয়। কেবলমাত্র তিল ও মেস্টাপাতা (টক জাতীয় এক প্রকার সবজি) পুরো ক্ষেতে ছড়িয়ে দেয়া হয়। মূলত কন্দ জাতীয় ফসলগুলো জুমের প্রান্তবর্তী স্থানে রোপণ করা হয় যেমন : হলুদ ও আদা। জুমক্ষেতটিকে মনলোভা করার জন্য অনেকে বুনো ফুলের গাছও রোপণ করে থাকেন। আমি গাঁদা ফুলসহ বেশ কিছু গার্ডেন ফ্লাওয়ারেরও দেখা পেয়েছি।
জুমের অন্যতম প্রধান ফসল ধান। জুমচাষীরা বিভিন্ন জাতের ধান চাষ করে থাকেন। তার ভিতর কামরাং, বাধোইয়া, কবরক, তুরগী, মেহলে, কাউন, বিরণী/বিন্নী, আমে সোরী ইত্যাদি মোটামোটি বেশ পরিবিত নাম। এই ধানগুলোর আবার অনেকগুলো উপজাত আছে। কবরক ধান এপ্রিলের মাঝামাঝি বোনা হয়। মেহলে, নাবোদা, রাংগী, কাউন ও গেলং আগস্ট মাসে, সোরী ও আমে সোরী সেপ্টেম্বর মাসে পাকে। কামরাংগা ধান মে মাসে আর সবার শেষে বিরণী ধান বোনা হয়। রেংপুই নামের একটি জাতের ধান চাষ করে থাকেন বম’রা। হাল্কা লালচে রঙের চাল হয়। খেতেও সুস্বাদু। আমি স্থানিয়দের কাছে দেখেছি এবং খেয়েছি কিন্তু কোন বইয়ে এ নামের ধানের কথা পাইনি। হয়তো ভিন্ন নামে ডাকা হয় অন্য ভাষায়। এছাড়া গ্যালং, বুক্কই, লেংদাচিগোন, দেলং, ফান্তে, চাকার্মা, ফ্রে, কুংদুম, নাইকং, তংদো সহ প্রায় ৩০ প্রজাতির ধানের নাম পাওয়া যায়।
বমদের কাছে আরও কিছু ধানের নাম শুনেছি যেমন: kungda, mongthong, reng- -pui, baa, vathao ইত্যাদি। ধান হয়তো একই কিন্তু জাতি ভেদে নাম ভিন্ন হয়। তাই এ বিষয়ে বিষদ গবেষণার সুযোগ রয়েছে। জুমে নানা জাতের সবজি, কন্দ (নানা প্রকারের আলু, নানা জাতের কচু, হলুদ, আদা), তিল, তুলা এমনকি কলাও চাষ করা হয়ে থাকে। তুলার চাষ ইদানিং কম করা হয়। বাণিজ্যিক উৎপাদন এখন আর হয় না। অথচ এক সময় প্রধান অর্থকরি ফসল ছিল তুলা। তামাক চাষ নিষিদ্ধ করে আবারও তুলার বাণিজ্যিক চাষে উৎসাহিত করা উচিত। জেদেনা (ইক্ষু/আখ গাছের মতো দেখতে এবং এর রসও আখের রসের মতো মিষ্টি। বম’রা বলেন কংচাং/ kongchang ) ও মরিচ চাষ করা হয়। তবে চিকন মরিচ (বমেরা বলেন মারসিয়াতে/ marhsiate) নামে ছোট একধরণের মরিচ আছে যা পাহাড়ে এমনিতেই জন্মে, চাষের প্রয়োজন হয় না। পাহাড়িরা রান্নায় এ মরিচই ব্যবহার করেন। তাই জুমচাষকে বহুফসলী কৃষিও বলা যেতে পারে।
বাংলাদেশে জুমচাষীদের অধিকাংশই প্রান্তিক চাষী। পার্বত্য অঞ্চলের ভূমি ব্যবস্থাপনার জন্য ভূমির প্রকৃত মালিক তারা নন। পাহাড়ে বিকল্প কোন পেশার উপায় না থাকায় জুমচাষই এদের প্রধান জীবিকা। আরও একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে একই জমিতে এক চাষেই বছরজুড়ে নানা ফসল পাওয়া যায় তাই জুমচাষই তাদের পছন্দের শীর্ষে থাকে।
জুম, জুমঘর, ফসল, উৎসব, ঐতিহ্য সম্পর্কে আমার দেখা ও জানা বিষয়গুলো শেয়ার করলাম। তবে বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। জুমচাষ পরিবেশ ও প্রতিবেশের জন্য ক্ষতিকর। নির্মম হলেও কথাটা বহুলাংশে সত্য। জুমের জমি তৈরি করার প্রক্রিয়াটি পরিবেশ ও জীববৈচিত্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশের পাহাড়গুলোর প্রাণ হচ্ছে গাছ। গাছ শূন্য ন্যাড়া পাহাড় কারও জন্য সুখকর নয়। জুমচাষের পক্ষে-বিপক্ষের অনেক পক্ষই আছেন। যে যার মতো করে যুক্তি উপস্থাপন করে থাকেন। এমনকি জুমচাষ নিয়ন্ত্রনের জন্য সরকারের একটি বিভাগও আছে। ১৯৬১ সালে ‘জুম নিয়ন্ত্রন বন বিভাগ’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। যার উদ্দেশ্য ছিল জুম চাষ নিয়ন্ত্রন, পরিবেশ ও বনভূমি রক্ষা, বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি ইত্যাদি। কিন্তু এই বিভাগের উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য দুটোই ব্যর্থতার মুখ দেখেছে। জুমের ক্ষতিকর দিকগুলো হচ্ছে ভূমিক্ষয়; মাটির পুষ্টি উপাদান হ্রাস; ঝিরি, খাল, নদী ও লেইক ভরাট এবং নাবত্য হ্রাস; জীব বৈচিত্র হ্রাস; জমির উর্বরতা হ্রাস; এলাকার প্রতিবেশ নষ্ট করা; বন্য প্রাণীর চারণভূমি হ্রাস; ভূমিধস; উষ্ণতা বৃদ্ধি ইত্যাদি। তবে ভূমিধসের বিষয়টা বেশ প্রশ্নবিদ্ধ। জুমের চাইতে অপরিকল্পিত বসতি, রিসোর্ট তৈরি করা, ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ ছাড়াই সড়ক নির্মাণ ভূমিধসের জন্য বেশি দায়ী।
সনাতন পদ্ধতির জুমচাষে পরিবেশ ও প্রতিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব আছে, এটা মানতেই হবে। জুমের জমি পোড়নোর জন্য অনুজীব ও কীটপতঙ্গ ব্যাপকভাবে ক্ষতির মুখে পরে। যার ফলে খাদ্য-শৃঙ্খলের উপর এর বিরূপ প্রভাব এড়ানো যায় না। জমির স্বল্পতা ও চাহিদার দ্রুত বৃদ্ধি এসব কারণে পূর্বের মতো এখন আর ১০/১৫ বছরের জন্য পাহাড়কে বিশ্রাম দেয়া যায় না। এমনকি গত ২ দশক আগে পর্যন্ত জুম আর্বতন চক্রের বিরতি দেয়া হতো ৫/৭ বছর। বর্তমানে ২/৩ বছর বিরতি দিয়েই বার বার জুমচাষ করতে বাধ্য হচ্ছেন পাহাড়িরা। সবচাইতে ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। পূর্বে যার একদমই ব্যবহার ছিল না। আগের মতো নিজেদের বীজ ব্যবহারের প্রথাও কমে আসছে। এখন জুমচাষীরা উচ্চফলনশীল (হাইব্রীড) জাতের বীজ ব্যবহারে আগ্রহী।
প্রাকৃতিক ভাবেই জুমঘর শিকারের টোপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটা আমার ব্যক্তিগত মত এবং এই বিষয়টা বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছি যে, পার্বত্য অঞ্চলে বর্তমান সময়ে অধিকাংশ শিকার জুমের আশ-পাশে ফাঁদ পেতে ধরা হয়ে থাকে। জুমের ফসল পাকতে শুরু করলে স্বভাবগত কারণেই কিছু প্রাণী ফসলের প্রতি আকৃষ্ট হয়। ফসল বাঁচাতে জুমচাষীদের জুম পাহারা ও রক্ষার পাশাপাশি সহজলভ্য শিকারকেও হাতছাড়া করতে চান না। আমিষের চাহিদা পূরণের জন্য সীমিত শিকারকে হয়তো মেনে নেয়া যেতে পারে। পাহাড়ে বসবাসকারি জাতিসত্তার মানুষেরা স্বভাব ও ঐতিহ্যগতভাবেই কম-বেশি শিকারে অভ্যস্ত। তার উপর ক্রমবর্ধমান জনবসীতর দ্রুত বৃদ্ধি এবং চাহিদার যোগানের জন্য অবাধে শিকার তো হচ্ছেই এবং জুমে শিকারের একটা রেওয়াজ প্রকট আকার ধারণ করেছে।
অতীতেও যে ছিল না তা নয়। তখন মানুষ ছিল কম, জুমও কম করা হতো। শিকারের প্রাচুর্য ছিল বেশি। এক্ষেত্রে ভূচর পাখি (মথুরা, বন মোরগ ইত্যাদি), পাখি, মায়া হরিণ, কাঠবিড়ালি, সজারু, বাশঁ ইঁদুর/গর্তবাসী ইঁদুর (বম’রা ‘যুবই’ বলেন), ভল্লুক (মহাবিপন্ন) বেশি শিকার হয়। আর অন্যান্য প্রাণীর অস্তিত্ত্ব তো এখন নেই বললেই চলে। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের প্রভাবটা আরও বেশি। স্থল ও জলের উভয় জায়গাতেই এর ক্ষতিকর দিক আছে। বিশেষত পাখি ও ঝিরির জলজ প্রাণিকুল সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যদিও জুমচাষীরা জুমের জন্য বড় গাছ কাটেন না এবং আগুনেও পোড়ানো হয় না তবে আগুনের জন্য ক্ষতি হতেই পারে। বাঁশ পোড়া ছাই জুমচাষের জন্য উত্তম তাই বাঁশ প্রধান পাহাড়ের ঢালকেই চাষীরা বেশি পছন্দ করেন। এতে বাঁশের প্রাকৃতিক বংশবৃদ্ধি ব্যহত হয়।
জুমচাষের পক্ষেও যুক্তি আছে। সরাসরি জুমচাষীদের বলেছি জুমের জন্য কি কি ক্ষতি হতে পারে। তাদের সহজ সরল উত্তর, ‘‘দাদা তাহলে খাবো কি?” যখন আরও একটু বিস্তারিতভাবে বলি তখন উত্তর আসে, জঙ্গল তো দাদা আবার হয়ে যায়, বড় গাছ তো পোড়াই না। এ কথা সত্য জুমে বড় গাছগুলো চা বাগানের ছায়াবৃক্ষের ন্যায় কাজ করে। ভূমিক্ষয়ের বিষয়টি ওরা বুঝতেই পারে না। তাদের যুক্তি এভাবে জলাশয় ভরাট হতে থাকলে তো কোন ঝর্না-ঝিরিই থাকতো না। আর আজ পর্যন্ত ভরাটের উদাহরণও নেই। উপরন্তু হাল সময়ে ঝিরির পাথর ব্যবহার করে রাস্তা, কালভার্ট নির্মাণ করা এবং অবৈধ পাথর ব্যবসার জন্য ঝিরিগুলো হুমকীর মুখে পরেছে।
সনাতন পদ্ধতির জুম পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এটা অপ্রিয় হলেও সত্য। তাই বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিও আবিস্কার হয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের সেভেন সিস্টার্স, চীন, নেপাল, মায়ানমার, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, লাওস, ভূটান, শ্রীলংকা এসব দেশেও জুমচাষের ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। ভারত, নেপাল ও শ্রীলংকাতে পাহাড়ি কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান আছে। নেপাল ও বাংলাদেশের দুটো প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে SALT (Sloping Agricultural Land Technology) নামে পাহাড়ে চাষের জন্য একটি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। কিন্তু এটি জুমচাষীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এছাড়া MATH ( Modren Agricultural Technology in the Hill) নামে আরও একটা পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি থাকলেও তা মাঠ পর্যায়ে পৌঁছাতেই পারেনি।

পাহাড়কে বাঁচাতে হলে পাহাড়িদেরকেও বাঁচিয়ে রাখতে হবে। পরিবেশের দোহাই দিয়ে জুমচাষ বন্ধ করা ঠিক হবে না। কারণ অতীতে ময়মনসিংহের গারো ও হাজংদের জুমচাষ বন্ধ করার পর তাদের জীবনে নেমে এসেছে তীব্র সংকট। বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না হওয়ায় তারা দ্রুতই দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হয়ে কোন রকমে টিকে আছে। কিন্তু বনভূমি উজার হওয়া থেমে থাকেনি বরং দ্রুতগতিতেই বন উজাড় হয়ে গেছে। তেমনি পার্বত্য তিন জেলায় জুম নিয়ন্ত্রনের আগে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রন জরুরি বলে মনে হয়। খুব দ্রুতার সাথেই পাহাড়ের লোক সংখ্যা বেড়ে চলেছে। আর এই বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মিটাতে নতুন নতুন পাহাড় জুমের আওতায় আনা হচ্ছে। তাই সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পাহাড়ে বিশেষ জন্ম নিয়ন্ত্রন প্রকল্প গ্রহণ করা জরুরি। সনাতন পদ্ধতি বাদ দিয়ে আধুনিক পদ্ধতিগুলো পাহাড়িদের কাছে পৌঁছে দেয়া এবং তা পালনে উৎসাহিত করা দরকার। তাহলেই হয়তো নব্য প্রস্তর যুগের শৈল্পিক চাষ পদ্ধতিটিকে আধুনিকায়ন করে টিকিয়ে রাখা যাবে। বাচিঁয়ে রাখা যাবে পাহাড় ও জীববৈচিত্র।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতা:
- The Hill Tracts of Chittagong & the Dwellers Therein-T H Lewin 2. The Chittagong Hill Tracts Living in Borderland – Willem van Schendel, Wolfgang Mey & Aditya kumar dewan. 3. Chittagong hill-tracts gazetteers -1971 4. Eastern Bengal and Assam District. Gazetteers – Chittagong Hill Tracts- R. H. Sneyd Hutchinson 5. বিভিন্ন জুমচাষী (বম, পাংখোয়া, খিয়াং) যারা মূল্যবান সময় নষ্টকরে নানা তথ্য প্রদান করেছেন, শেয়ার করেছেন বাস্তব অভিজ্ঞতা। লেলুং খুমী, বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা, সিংইয়ং ম্রো এর আর্টিক্যাল।
(লেখাটি পাক্ষিক পার্বত্যনিউজ, বর্ষ ১, সংখ্যা ০৬-০৭ প্রকাশিত, মে ২০১৮)
ছবি : লেখক, আলী ও পারভেজ ।