প্রাক কথন ও ভৌগলিক অবস্থান
অঞ্চল হিসেবে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম মূলত পাহাড়-উপত্যকা বেষ্টিত এলাকা। চট্টগ্রাম বিভাগের এই অঞ্চল পাহাড় ও উপত্যকাময় বলে নামকরণ হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। এর অধীনে রয়েছে রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলা। পার্বত্য ভূমি বৈশিষ্ট্যের কারণে এ অঞ্চলটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এখানকার ভূমি বৈশিষ্ট, জলবায়ু থেকে শুরু করে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি-সংস্কৃতি সমতল অঞ্চল থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আয়তন ১৩,২৯৫ বর্গ কিলোমিটার, যা দেশের সর্বমোট আয়তনের প্রায় ১০ শতাংশ। পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, দক্ষিণে মায়ানমারের আকিয়াব অঞ্চল, পূর্বে ভারতের মিজোরামের লুসাই পাহাড়পুঞ্জ ও মায়ানমার এবং পশ্চিমে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা। জাতিবৈচিত্রে সমৃদ্ধ অঞ্চল এই পার্বত্য চট্টগ্রাম। বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের নানা সংস্কৃতির বৈচিত্র্যপূর্ণ সম্ভার বাংলাদেশের অনন্য সম্পদ। এখানে বসবাসকারী বিভিন্ন ভাষাভাষী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে বম জনগোষ্ঠী অন্যতম। স্থানীয় অন্যান্য ভাষাভাষীদের কাছে বমরা ‘লাঙ্গে’ নামেও পরিচিত। এছাড়া তাদের বনযোগীও বলা হয়।
পার্বত্য অঞ্চলে বসবাস করা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সমূহের মধ্যে জনসংখ্যার অনুপাত হিসেবে বমদের স্থান অনেক নিচের দিকে। এদের সঙ্গে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী লুসাই, পাংখোয়া এবং খুমিদের আচার-আচরণ এবং ভাষাগত সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়াও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এবং মায়ানমারের চিন প্রদেশে বম জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর মধ্যে বম জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে মণিপুর ও মিজোরামে। পার্বত্য বান্দরবান জেলার রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি ও জেলা সদর এবং পার্বত্য রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলায় প্রায় ৭০টি গ্রামে বমরা বসবাস করে। সরকারি পরিসংখ্যানে বম জনগোষ্ঠীর পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনও তেমন একটা পাওয়া যায় না। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে বম জনগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যা ১১,৩৬৭ জন উল্লেখ রয়েছে। তবে বমরা সরকারি এই পরিসংখ্যানটি যথাযথ নয় বলে মনে করে। তাদের ধারণা সংখ্যায় তারা আরও বেশি হয়ে থাকবে। গত দেড়শ বছরে পরিচালিত কয়েকটি আদম শুমারির তথ্য আলোকপাত করলে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধির গতি সম্বন্ধে একটি চিত্র পাওয়া যায় :
১৮৭২ সালের শুমারি অনুয়ায়ী বম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৩০৫ জন, ১৯০১ সালের ৬৯৬ জন, ১৯৫৯ সালের ৯৭৭ জন, ১৯৮১ সালের ৭৩৩ জন, ১৯৯১ সালের ৬,৬৭৮ জন এবং ২০১১ সালের পরিচালিত আদম শুমারির অনুয়ায়ী ১১,৩৬৭ জন।
দুর্গম অঞ্চলে বসবাসকারী অরণ্যচারী বম জনগোষ্ঠী তুলনামূলকভাবে এখনও অনেক পিছনে পরে রয়েছে। ভৌগলিক অবস্থান ও দূরত্বের জন্য তারা উন্নয়নের সুযোগ হতে কিছুটা বঞ্চিত। বছরের অধিকাংশ সময় গভীর অরণ্যে শিকার করে তাদের সময় কাটে। জুম চাষ তাদের প্রধান জীবিকার অবলম্বন। জুম চাষ ও শিকারের জন্য তারা সাধারণত কুমারী বনাঞ্চলে বসবাস করে। যার কারণে নিজ জনগোষ্ঠী ছাড়া সমতলে বা অন্য জনগোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগ কম। গহীন অরণ্য, পাহাড়, ঝর্ণা অর্থাৎ নির্মল প্রকৃতির সাথে মিশে থাকা মানুষগুলোর জীবন অত্যন্ত সহজ ও সরল। শিকার স্বভাবজাত; প্রকৃতি প্রেমী এ জনগোষ্ঠীর জীবনে কালের পরিবর্তনের ধারায় বর্তমানে কিছু পরিবর্তন আসছে। বিলম্বে হলেও সমকালের সঙ্গে তারা ক্রমেই নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে সচেষ্ট হয়ে উঠছে।
ঐতিহাসিক পটভূমি
অদ্যাবধি প্রাপ্ত তথ্যে লক্ষ্য করা যায়, বমদের ইতিহাস অনুসন্ধানে ভাষাগত বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দেখা যায়, চিন (মায়ানমারের একটি প্রদেশ) ভাষার মাপকাঠির বিচারে গবেষকগণ বম জনগোষ্ঠীকে ‘কুকি’ বা ‘চিন’ বলে জোর দাবি করেছেন। ঊনবিংশ শতকের পূর্বে এবং বিংশ শতকের বিভিন্ন লেখালেখি সমূহে বমদেরকে ‘চিন’ জাতির উপশাখা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। বমদের আদি নিবাস নিয়ে নান রকম কাহিনী প্রচলিত আছে। বলা হয় চিনের চিনলুং এলাকার এক গুহা থেকে তারা এসেছে। ধারণা করা হয় এই কাহিনী মনে রাখার জন্য বান্দরবান জেলার একটি বম গ্রামের নাম চিনলুং রাখা হয়েছে।
এই বিষয়ে একটি বহুল প্রচলিত গীত:
কা পা লাম ত্লাক আ ঠান দাং / সিন লুং লাম ত্লাক অ আ দাং
অর্থ:
আমার পিতা পদপাত অতি চমৎকার / সিন লুং পদপাত অতি চমৎকার

বনযোগী/বম এবং পাংখোয়া এই দুই জনগোষ্ঠী তাদের নিজেদের সম্পর্কে বিশ্বাস করে যে, তারা আসলে দুই ভাইয়ের বংশ থেকে বিস্তৃত হয়েছে। থমাস হারবার্ট লেউইনের পর্যবেক্ষণ মোতাবেক তাদের মধ্যে সামাজিক প্রথা, স্বভাব ও ভাষার সামঞ্জস্য দেখে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। মানুষের সৃষ্টি ও আদি উৎস সম্পর্কে তাদের বিশ্বাস খুবই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। এই বিশ্বাসের ভিত্তি স্বরূপ লেউইন লোক মুখে শোনা প্রচলিত একটি গল্পের হুবহু বর্ণনা করেছেন:
‘প্রথমে আমাদের পূর্ব পুরুষ একটি গুহার ভিতর থেকে এই পৃথিবীতে এসেছিল। তখন আমাদের একজন প্রধান ছিলেন; তার নাম তৎলানড্রোক-পাহ্। তিনিই প্রথম গয়াল পালন করেছিলেন। তিনি এতটাই ক্ষমতাধর ছিলেন যে, দেবতার মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন। সেই বিয়েতে মহা ধুমধাম হয়েছিল এবং তৎলনড্রোক-পাহ্ দেবতাকে তাঁর নিজের বিখ্যাত বন্দুকটি উপহার দিয়েছিলেন। এখনও ওই বন্দুকের আওয়াজ শোনা যায়; বিশেষ করে যখন আকাশে বিদ্যুৎ চমকায়। বিয়ের দিন আমাদের প্রধান সবাইকে ডেকে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে দেবতার বাড়ি পর্যন্ত যাওয়ার জন্য একটি রাস্তা কাটতে আদেশ দিলেন। খুশি মনে সবাই কাজে লেগে গেল এবং নববধূকে স্বামীর বাড়ি নিয়ে আসতে সাহায্য করল। কেবল লেঙ্গুর, যার দাদা ছিল হুলুক বানর আর কেঁচো এই কাজে সাহায্য করেনি। যার কারণে এদের অভিশাপ দেয়া হয় এই বলে যে, মৃত্যু পর্যন্ত এরা সূর্যের মুখ দেখতে পারবে না। যে গুহা থেকে মানুষ প্রথম বেরিয়ে এসেছিল, তা লুসাই দেশে ভানহুইলেন গ্রামের কাছে। এটা এখন বার্দাইয়া উপজাতির দখলে; এখনও গুহাটি সেখানে দেখা যায়, তবে ভিতরে প্রবেশ করা যায় না। কাছে গিয়ে ভালো করে কান পাতলে গুহার ভিতরে মানুষের গমগম আওয়াজ শোনা যায়। তৎলনড্রোক-পাহ্ এর বিয়ের পর পুরো দেশ একবার আগুনে পুড়ে গিয়েছিল। তাঁর স্ত্রী অর্থাৎ দেবতার মেয়ে আমাদের সবাইকে সমুদ্রের কাছে নামতে বলেছিলেন; কারণ সেখানে ঠান্ডা ছিল। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আমরা এই দেশে এসেছিলাম (বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকা সমুদ্রের নিকটবর্তী)। সেই সময়ে মানুষ ও পশুপাখি সকলে একই ভাষায় কথা বলতো। তখন দেবতার মেয়ে তাঁর বাবার কাছে নালিশ করল যে, এখানে মানুষেরা খাবারের জন্য পশু হত্যা করতে পারছে না। কারণ পশুরা মানুষের সাথে কথা বলে এবং করুণ স্বরে প্রাণভিক্ষা চায়। আর মানুষের হৃদয় অত্যন্ত কোমল বলে সে পশুকে হত্যা না করে ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। এই কথা শুনে দেবতা পশুপাখিদের কথা বলার ক্ষমতা ফিরিয়ে নিলেন এবং তারপর থেকে আমাদের এখন প্রচুর খাবার। কথা বলতে পারে না, এমন সব প্রাণীই আমরা এখন খাই। সেই আগুন লাগার সময় আরও একটি ঘটনা ঘটে। পৃথিবী ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল এবং মানুষেরা হারিয়ে গিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তারপর থেকেই এতো আলাদা জাতির উদ্ভব হয়েছে এবং সবার ভিন্ন ভিন্ন ভাষা সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের দু’জন দেবতা আছেন- খুজিং এবং পাথিয়ান (বর্তমানে বমরা বলে, এই দুইজন আসলে একজনই, ধর্মান্তরিত হওয়ার পর খুজিংকেই পাথিয়ান বলে সম্বোধন করা হয়)। পাথিয়ান সব থেকে বড় এবং তিনিই এই পৃথিবীর সৃষ্টি করেছেন। তিনি এখান থেকে পশ্চিমে বাস করেন এবং রাতের বেলায় সূর্যের রক্ষণাবেক্ষণ করেন। অন্যজন হচ্ছেন খুজিং যিনি আমাদের পালনকর্তা। আমরা তাকে খুব ভালোবাসি। বাঘ হচ্ছে খুজিং-এর বাড়ির কুকুরসম বা পাহারাদার। তাই সে আমাদের কখনও আঘাত করে না কারণ আমরা সকলেই তার প্রভূর সন্তান।’
বমদের এই অঞ্চলে আগমন এবং বসতি স্থাপনকাল নিশ্চিত করা দুরূহ কাজ। তবে ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় বর্তমান স্থানে তাদের আগমন অষ্টাদশ শতকে। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন ও ইতিহাসবিদদের লেখনী এবং স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত তথ্যাদি থেকে জানা যায় সর্বপ্রথম তাদের ‘পাংহয়’ গোত্র পার্বত্য চট্টগ্রামের মধু ও সাঙ্গু এলাকায় আগমন করে। পরবর্তীতে চিম্বুক পাহাড়ের দিকে সরে এসে রেছা, সোয়ালক এবং বজালিয়া এলাকায় বসতি স্থাপন করে। ইয়োরোপিয় পরিব্রাজক ফ্রান্সিস বুকানন পার্বত্য চট্টগ্রাম ভ্রমণ বৃত্তান্তে উল্লেখ করেছেন ১৮ এপ্রিল, ১৭৯৮ সালে ‘বজালিয়া বা বোমাং হাট’ নামক জায়গায় তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান কালে ৬ জন বম নারী-পুরুষের দেখা পেয়েছিলেন। প্রায় একই সময়ে চিন পর্বত এলাকায় বসবাস করা তাদের অন্য গোত্র ‘শুনথ্লা’ নেতা লিয়ানকুং তার অনুসারীদের নিয়ে এই অঞ্চলে আগমন করেন এবং স্বজাতীয় ‘পাংহয়’ গোত্রীয়দের কাছাকাছি বসতি স্থাপন করেন। যদিও তৎকালীন সময়ে এই দুই গোত্রের মধ্যে তেমন সদ্ভাব ছিল না, তারপরও তারা কাছাকাছি অবস্থান করে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সামাজিক এবং পারিপার্শ্বিক কারণে দুই গোত্র একত্রীভূত হয়ে যায়। তাদের ধারণা তারা মূলত দক্ষিণ দিক থেকে এসেছিল এবং মায়ানমারের চিন জাতি থেকে বিস্তৃতি লাভ করেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী কোন জনগোষ্ঠী কখন বা কোন সময় এসে বসতি গড়ে তোলে তা বলা কঠিন। এ নিয়ে আর একটি মতেরও সন্ধান পাওয়া যায়, যা থেকে বমদের আগমনের ইতিহাসকে আবার ভিন্ন রূপে উপস্থাপিত হতে দেখা গিয়েছে। বিভিন্ন তথ্য ও নৃ-গোষ্ঠী সমূহের অবস্থানগত দিক বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় ‘কুকি’ নামক জনগোষ্ঠীই সর্বপ্রথম এই অঞ্চলে বসবাস করতো। তা ছিল একাদশ শতকের গোড়ার দিকে। পরবর্তীতে এই ‘কুকি’ শব্দটি লোপ পায় এবং ক্রমেই বনযোগী, বম, পাংখোয়া, লুসাই প্রভৃতি নাম তথা একাধিক গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে বলে কোন কোন ঐতিহাসিকের ধারনা।
সূত্র: পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বম – ফেরদৌস জামান, বেজক্যাম্প বাংলাদেশ লি.। লেখাটি সংক্ষিপ্ত ও পরিমার্জিত।
ফিচার ছবি : মির্জা রাসেল।
ছবি : লেখক।
You made some really good points there. I looked on the
internet to find out more about the issue and found most
individuals will go along with your views on this site.
Thank you very much. Keep in touch, some more chapters are in pipeline. You can make any comment on this topic, so that I can enrich the write up as well as myself.
Long time supporter, and thought I’d drop a comment.
Your organization’s wordpress site is very sleek – hope you don’t
mind me asking what theme you’re using? (and don’t mind if I steal it?
:P)
I just launched my small businesses site –also built in wordpress like yours– but the theme slows (!) the site down quite a bit.
In case you have a minute, you can find it by searching for “royal cbd” on Google (would appreciate any feedback) – it’s
still in the works.
Keep up the good work– and hope you all take care of yourself during the
coronavirus scare!
~Justin
Thanks for the purpose of providing these superior subject matter.
I am sure this paragraph has touched all the internet visitors, its really really fastidious piece
of writing on building up new website.
Thanks a Lot
o really! Thanks a lot for your appreciating and inspiring comment.
Unbelievably individual pleasant site. Huge info readily available on few clicks on.
Thank you dear reader. Your inspiring comment is our strength.