ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ, অপরিকল্পিত নগরায়ন, শিল্পায়ন এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নসহ নানাবিধ কারণে দেশের জীববৈচিত্র হুমকির মুখে। জেনে বা না জেনে সরকারী ও বেসরকারী বিভিন্ন উদ্যোগ বা প্রকল্প বাস্তবায়নের খাতিরে নির্বিচারে বনভূমি ধ্বংস করা হচ্ছে। যার ফলে আশঙ্কাজনক হারে কমে আসছে বনভূমির আয়তন এবং বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বহু প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি। এই পরিস্থিতিতে দৃষ্টান্ত স্বরূপ আশার আলো জাগাতে শুরু করেছে রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্য। আমরা জানি সুন্দরবন বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ সংরক্ষিত সমতল বন। আয়তনের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্য। এই অভয়ারণ্য হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলায় অবস্থিত। রেমা-কালেঙ্গা ‘তারাপ হিল রিজার্ভ ফরেস্ট’ এর একটি অংশ। অভয়ারণ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে ১৯৮২ সালে। এই রেঞ্জ এর অধীনে রয়েছে ৪টি বন বিট: রেমা, রশিদপুর, কলেঙ্গা ও ছনবাড়ি। রেমা-কালেঙ্গার মোট আয়তন ১৭৯৫ হেক্টর (১৪২৮১.২৯ একর )। বনভূমি জুরে রয়েছে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা – সাঁওতাল, টিপরা এবং ওরাওদের বসবাস। তাদেরকে ভিলেজার বলা হয়ে থাকে। এছাড়াও রয়েছে বাঙালি ভিলেজার। বর্তমানে বাঙালিসহ ভিলেজারের সংখ্যা ১৯৭ (পরিবারের প্রধানকে একজন ধরে)। মংড়া বাড়ি, কালাই বাড়ি, পুরান বাড়ি, হরিন মারা বাড়ি সহ বনের ভেতর ৭/৮টি বসতি রয়েছে। চষাবাদ ছাড়াও তাদের প্রধান পেশা কাঠ ও বেত সংগ্রহ করা এবং বেতজাত দ্রব্য বিক্রি করা। জানা যায় বনের ভারসাম্য রক্ষায় ১৯৮২ সালে বন বিভাগ প্রায় ২৮৫টি পরিবারকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে। এমনও জানা যায়, সেই উচ্ছেদ কাজে হাতির ব্যবহার করা হয়েছিল। উচ্ছেদ হওয়া অনেক পরিবার চিরদিনের মত পূর্বপুরুষের ভিটে ছেড়ে পাড়ি দেয় ভারতে। বর্তমানে বনের জীববৈচিত্র রক্ষায় ভিলেজারদের রয়েছে অসামান্য ভূমিকা। রক্ষণাবেক্ষণ থেকে শুরু করে পাহারা দেয়ার দায়িত্ব তাদের। বিনিময়ে ১৯২৭ সালের ফরেস্ট এ্যাক্ট অনুযায়ী প্রতি ভিলেজারকে আড়াই একর আবাদি এবং বসত বাড়ির জন্য আধা একর করে জমি প্রদান করা হয়েছে।

অভয়ারণ্যটিতে রয়েছে ৩ প্রজাতির বানর- কুলু, রেসাস ও লজ্জাবতী। রয়েছ মুখপোড়া হুনুমান, চশমা হুনুমান, উল্লুক, সজারু, মায়া হরিণ, বন্য শুকর, গন্ধগোকুল, বেজী। ৫ প্রজাতির কাঠবিড়ালীর মধ্যে বিড়াল জাতের মালয়া কাঠবিড়ালী সহ ৩৭ প্রজাতির পশু। টিয়া, হিল ময়না, লাল মাথা কুচকুচি, সিপাহী বুলবুল, বসন্তবৌরী, শকুন, মথুরা, বন মোরগ, পেঁচা, মাছরাঙ্গা, ঈগল, চিল, ডাহুক, সাত ভেয়ালা, রঙ্গিন কাটঠোকরা, রাজ ঘুঘু, তিল ঘুঘু, স্যামা, ফিঙে, হলুদ বুলবুলি ও দুই লেজওয়ালা ভিমরাজ সহ ১৬৭ প্রজাতির পাখি। এছাড়াও রয়েছে ৭ প্রজাতির উভচর ও ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ। বনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ মুখপোড়া হুনুমান, যার দর্শন নিতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলার দরকার পরবে না। বনে প্রবেশের পর যে কোন দিকে বিশ থেকে পঁচিশ মিনিট হাটলেই দেখা মেলে গাছের ডালে দল বেঁধে বসে থাকা হুনুমান। বিলুপ্ত প্রায় মালয়া কাঠবিড়ালী গাঢ় খয়েরি রঙের। আকারে প্রমান সাইজের বেজির সমান। উঁচু বৃক্ষগুলোর কান্ড ধরে কেবল ওদেরই ওঠানামা। আর ধূসর বর্ণের ছোট কাঠবিড়ালী তো সারাটা বুনো পথেরই শোভা। উল্লুকের দেখা সহজে পাওয়া যায় না, তবে তাদের উচ্চ স্বরের ডাক শোনা যায় অনেক দূর থেকে। বনের কোথাও এতোটাই ছায়াময় যে, গাছের মগডালে হুনুমানের হঠাৎ নড়াচড়ায় যে কেউ ভয় পেয়ে যেতে পারে।
বানর এই বনের আর এক সহজলভ্য প্রাণী, সাধারণত গাছের মগডালে এদের বিচরণ। আবার কখনও কখনও গাছ ছেড়ে দল বেঁধে নিচে নেমে আসে। বন মোরগের চলাফেরা বনের সর্বত্র। খাবার খাওয়ার জন্য সন্ধ্যার আগ দিয়ে বাচ্চা-কাচ্চ নিয়ে ফাঁকা প্রান্তরে বেরিয়ে আসে। বাঘের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। তবে কয়েক বছর আগেও কিছু দিনের ব্যবধানে ৫-৬টি গরুর ক্ষতবিক্ষত মৃত দেহ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের ধারণা, এটা বাঘেরই কাজ এবং তারা মনে করে রেমা-কালেঙ্গার বন থেকে বাঘ একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। পৃথিবীর ১৮ প্রজাতির শকুনের মধ্যে বাংলাদেশে ছিল ৭ প্রজাতির অস্তিত্ব, বর্তমানে টিকে আছে মাত্র ১ প্রজাতি। মহাবিপন্ন শকুন রক্ষায় বন বিভাগ ও আইইউসিএন (ইন্টরন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার) এর যৌথ উদ্যোগে দেশে দুইটি শকুন অভয়াশ্রম রয়েছে। তার মধ্যে একটি রেমা-কালেঙ্গা বনের ময়নাবিল এলাকায় অবস্থিত। আইইউসিএন এর তথ্যমতে, দেশে এপর্যন্ত জীবিত শকুনের সংখ্যা মাত্র ২৬৮টি। যার মধ্যে ১৫০টিরও বেশি শকুনের বসবাস ময়নাবিল অভয়াশ্রমে।
উদ্ভিদ রয়েছে ৬৩৮ প্রজাতির, এদের মধ্যে গর্জন, শিমুল, চাপালিশ, হারগোজা, কড়ই, তেলসুর, শাল, সেগুন, অর্জুন, জাম, শুকরি চাপা, বাঁশ, বেত ও ১৮ প্রজাতির বট উল্লেখযোগ্য। বন্য পথে রেমা থেকে কালেঙ্গার দূরত্ব ১২ কিলোমিটারের মত। এই দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে যাওয়ার পথে বিশেষ কিছু জায়গায় দু’চারটি পরিণত বয়সী গাছের কাটা গুড়ি দেখা যায়, যা পূর্বের তুলনায় কম। পরবর্তীতে রেঞ্জ ও বীট কর্মকতাদ্বয়ের সাথে আলাপ কালে বিস্তারিত জানা যায়। তারা জানান, একটা সময় ছিল যখন অত্র এলাকার জনগোষ্ঠীর পেশাই ছিল বন নির্ভর। দেখা যেত সকাল হলে পান্তা খেয়ে স্বামী-স্ত্রী ও ছেলে-মেয়ে সকলেই দা-কুঠার হাতে বেরিয়ে পড়তো বনের উদ্দেশ্যে। তারউপর কাঠ চোরাকারবারী দলগুলোও ছিল তৎপর। এভাবে গাছ থেকে শুরু করে পশুপাখি নির্বিচারে উজার হয়ে গেলেও এর বিপরিতে কার্যত কোন বাঁধা ছিল না। অথচ বর্তমানের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। জীবন জীবীকার তাগিদে যেই এলাকাবাসীর একমাত্র কাজই ছিল বন ধ্বংস করা, সেই জনগনই এখন বনের পাহারাদার।
বনের মাঝে নির্দিষ্ট দূরত্বে রয়েছে পাহরা চৌকি। চৌকিকে কেন্দ্র করে প্রতিটি দলে থাকে চার থেকে ছয়জন পাহারাদার। কোন কোন দলে বন বিভাগের পক্ষ থেকে একজন বন্দুকধারী আনসার সদস্য নিয়োজিত থাকে। কর্মকর্তাদ্বয় জানান, এত বড় একটি বন রক্ষণাবেক্ষণে আমরা বন বিভাগের মাত্র কয়েক জন লোক, যা মোটেও পর্যাপ্ত নয়। এর মধ্যে গানম্যান আনসার রয়েছে মাত্র তিনজন। সুতরাং এলাকাবাসীর অংশগ্রহণ ছাড়া এই বন রক্ষা করা কোন ক্রমেই সম্ভব ছিল না। বিকেল চারটার সময় বনের বেতবাগান এলাকার দিকে যাওয়ার পথে প্রবেশ মুখে দেখা হয় চারজন যুবকের সাথে। কারও হাতে তীর-ধনুক তো কারও হাতে লাঠি-বল্লম। জিজ্ঞেস করে জানা যায়, পাহারা শেষ করে সকলেই বাড়ি ফিরছেন। কিভাবে বা কি হিসেবে পাহারা দেয়া হয়ে থাকে জানতে চাইলে তারা জানান, “আমরা যারা ভিলেজার আছি একটা নির্দিষ্ট বয়স হলেই প্রত্যেককে পাহারা দেয়ার কাজে শামিল হতে হয়। সেক্ষেত্রে প্রতি ছয় ঘন্টা পর পর দল পরিবর্তন হয়ে থাকে। সন্ধ্যার খানিক পর বনের আর এক অংশে যাওয়ার পথে হঠাৎ একজন ষাটোর্ধ বৃদ্ধ লাঠি হাতে পথ রোধ করে দাঁড়ান। জানতে চান, আমরা কারা এবং কোথায় যেতে চাই? তাকে বোঝাতে সক্ষম হলে তবেই অগ্রসর হওয়া সম্ভভ হয়। এরকম বেশ কয়েকটি জায়গায় প্রতিরোধের মুখে পড়তে হল। দিনরাত এভাবে বন পাহারা দেয়ার পিছনে তাদের রয়েছে সামান্য স্বার্থ। বন বিভাগ কর্তৃক বরাদ্ধ করা সেই আবাদি জমি ও বসতবাড়ি নির্মানের জায়গা। এছাড়াও বনের নির্দিষ্ট কিছু এলাকা বাফার জোন বলে নির্ধারিত। এই বাফার জোনে বন বিভাগের সহযোগিতায় লাগানো হয়েছে নানা প্রজাতির বনজ ও ওষধি গাছ। নির্দিষ্ট সময় পর গাছগুলো কাটা হয়। বিক্রিত অর্থ বিধি অনুযায়ী তাদের মাঝে সমানভাবে বন্টন করা হয়ে থাকে। এছাড়াও গাছ থেকে আহরিত ফল বা লাকড়ি সব তারাই ভোগ করে থাকে। আমরা ইতোমধ্যেই জেনেছি রেমা-কালেঙ্গায় বন মোরগ বা মুরগী রয়েছে প্রচুর। স্থানীয়দের স্বচেতনতা এতটাই উন্নত পর্যায়ে এসেছে যে, মুখের সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখলেও কেউ একটি ঢিল পর্যন্ত ছুড়ে মারে না। অধিকন্তু অন্যান্য পশুপাখি শিকার বা নিধন না করার বিষয়টি স্থানীয়ভাবে রীতিমত এক প্রথায় রূপ নিয়েছে।
প্রায় এক দশক আগে রেমা-কালেঙ্গার তৎকালীন রেঞ্জ কর্মকর্তার সাথে অন্তরঙ্গ আলাপে বলেছিলেন, বংশ পরম্পরায় কিছু স্থানীয় বাসিন্দা কাঠ সংগ্রহ পেশায় জড়িত। এদের প্রতিহত করতে সম্পূর্ণ রেঞ্জ এর জন্য নিয়োজিত বন বিভাগের মাত্র ৩১ জন লোকবল নিয়োজিত। এত বড় বন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এই সামান্য লোকবল খুবই নগন্য। পরিশেষে তিনি রেমা-কালেঙ্গায় তার কর্ম জীবনে অভিজ্ঞতা থেকে হতাশার সুরে বলেছিলেন, এই বন ও বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ধরে রাখা কঠিন। রেমা-কালেঙ্গা আসলে শেষপর্যায়ে এসে ঠেকেছে। অথচ কয়েক বছরের ব্যবধানে আজকের বাস্তবতায় লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, বন বিনাশ তো দূরের কথা তারা এখন বনকে সমাজের সম্পদ মেনে নিয়ে তা রক্ষার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন।
বন রক্ষায় স্থানীয়দের কর্মকান্ড কেবল পাহারা দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বনভূমি রক্ষার বিষয়টি ক্রমেই সেখানে এক সংস্কৃতিতে রূপ নিয়েছে, যাকে একটি পরিচ্ছন্ন আন্দোলন হিসেবেও আখ্যায়িত করা যেতে পারে। তৈরি হচ্ছে গান, নাটক ইত্যাদি। কথা হয় কালেঙ্গা বাজারের ঔষধ ব্যবসায়ী মো. নূর-উল-আলম স্বপন এর সাথ। পেশায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হলেও প্রকৃতির প্রতি রয়েছে তার অসামান্য মমতা। তিনি নিজে একজন নাট্যকার। স্ব-উদ্যোগে রচনা করেছেন নাটক যা নিজ পরিচালনায় মঞ্চস্থও করেছেন। নাটকের বিষয়বস্তু জীববৈচিত্র কেন্দ্রীক। নাটকটির সমস্ত কলাকুশলী স্থানীয় যুবসমাজ থেকে আগত। নূর-উল-আলম স্বপনের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রকৃতিকে ভালোবেসে তার নানান কর্মকান্ডের কথা। তিনি জানান, পরিবেশ স্বচেতনতামূলক তার লেখা নাটক ইতিমধ্যে বেসরকারী টিভি চ্যানেলেও প্রচারিত হয়েছে। প্রকৃতির অন্যতম প্রধান উপাদান এই বনভূমি রক্ষায় বন বিভাগের পাশাপাশি সাধারণ জনগনের অংশগ্রহণ অত্যান্ত জরুরি বলে তিনি মনে করেন। রেমা-কালেঙ্গা বিষয়ক তার বিস্তর অভিজ্ঞতার আলোকে জানান, জীববৈচিত্র রক্ষায় বন বিভাগ ও স্থানীয়দের সমন্বিত প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে দৃষ্টান্ত স্বরূপ। তবে বনের মাঝে ভিলেজারদেরকে বরাদ্ধ দেয়া জমিতে যে ফসল বিশেষ করে ধান চাষ করা হয়ে থাকে তা বনের জীববৈচিত্রের জন্য ভয়ানক ক্ষতির কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কারণ বর্তমানে ধান চাষে উচ্চমাত্রার রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যাবহার করা হয়ে থাকে যা, পশুপাখির জন্য বিপদজনক। অধিকন্তু, চাষাবাদে পাওয়ারটিলার মেশিন ব্যবহারের ফলে তা থেকে নির্গত বিকট শব্দ প্রতিনিয়ত বন্য পশুপাখির স্বাভাবিক বিচরণে ব্যাপক বাঁধার সৃষ্টি করে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে ভিলেজারদেকে বিশেষ প্রকল্পের অধীনে এনে বিকল্প পদ্ধতিতে তাদের খাদ্য চাহিদা পুরনের ব্যবস্থা করা অথবা সম্পূর্ণ সনাতন পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা যায় কি না, সংশ্লিষ্ট বিভাগ সে ব্যাপারে ভেবে দেখতে পারে বলে তিনি মনে করেন। পরিশেষে বলা যায়, বন রক্ষায় বন বিভাগ এবং এলাকাবাসীর সমন্বিত প্রচেষ্টা যে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে তার উজ্জল দৃষ্টান্ত রোমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্য।
ফিচার ছবি : STHN