প্রজারূপে রাজরূপ ধারণ করে নিরন্তর জল দিয়ে মাতামুহুরীর জলধারাকে সমৃদ্ধ করে চলেছে এক রূপসী। সর্পিল দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অক্লান্তভাবে ছুটে চলা স্রোতস্বিনীটি প্রাণবন্ত করেছে বিস্তীর্ন অঞ্চল। গড়ে তুলেছে অপার সৌন্দর্যের মহাকাব্যিক স্বর্গভূমি।
বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের নদী প্রণালীতে সাংগু ও মাতামুহুরী দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে বয়ে চলেছে। সাংগু ও মাতামুহুরীর জলবিধৌত দুটি উপত্যকাকে দ্বিখন্ডিত করে মহাপ্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে আছে বান্দরবান পর্বতসারি। মোটাদাগে বলা যায় প্রায় স্বতন্ত্র রাজত্ব নিয়েই সাংগু পূর্ব দিকের সুউচ্চ পর্বতসারি ও বান্দরবান পর্বতসারির মধ্যবর্তী উপত্যকাটিতে রাজত্ব করছে। মাতামুহুরীর রাজত্বটি হচ্ছে বান্দরবান পর্বতসারির পশ্চিম দিক থেকে মাতামুহুরী পর্বতসারি অর্থ্যাৎ মিরিঞ্জা রেঞ্জ পর্যন্ত। সাংগুর দীর্ঘ পথচলা শেষ হয়েছে বান্দরবান শহর ছুঁয়ে আরও পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে বঙ্গপোসাগরে। মাতামুহুরীর মহারাজ্যপটের একটি ক্ষুদ্র অংশে এক রাণী গড়ে তুলেছে তার ছোট অথচ বৈচিত্রময় একটি রাজ্য। সে রাজ্যের রাণীর নামটি হচ্ছে তৈন। হ্যাঁ, টোয়াইন খাল।

জানা নেই কি ভাবে তৈন নামটি টোয়াইন হয়ে গিয়েছে। তবে ক্যাপ্টেন টি এইচ লুইন এর লেখায় ‘Twine Khyoung’ (টুইন খ্যং) নামটির উল্লেখ আছে। তৈন খাল নিয়ে তাঁর কিছু বিবরণ পাওয়া যায়- ‘The Stream ran briskly in a narrow pebbly bed, between banks that rose nearly perpendicularly, and so high that the sun only came down to us by glints, here and there.’ নদীর দুই পাড় সোজা উপরে উঠে গেছে এবং এমন খাড়া যে অল্প কিছু যায়গায় সূর্যের আলোর ঝিকমিক দেখতে পাওয়া যায়। আমরা তৈন নামটিই ব্যবহার করেছি। যাহোক, রেমাক্রি খালের প্রেমমুগ্ধ, রাইনক্ষিয়াং এ আসক্ত থাকায় বারবার তৈন হাত ফসকে যেতো। হাতের লক্ষী পায়ে ঠেলে কতদিন আর দূরে রাখা যায়।
আলীকদম সদরের কাছেই তৈন নিজেকে সমর্পন করেছে মাতামুহুরীতে। তৈন খালের দুইটি রূপ আছে, একটি রুদ্র রূপ আর একটি চঞ্চলা চপলা নিরালায় খেয়ালী শান্ত অভিমানী রমনীয় রূপ। ভরা বর্ষায় তৈন বেশ দুর্গম আর দুর্দান্ত প্রতাপ নিয়ে পুরাণের দেবীর মতই রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। সর্বসংহারী, বাঁধনহারা উন্মত্ত উন্মাদনায় তান্ডব করে। বছরের বাকিটা সময় খেয়ালী অভিমানী। এ খেয়াল চৈত্র-বৈশাখে এতটাই ছেলে খেলায় চলে আসে তখন তৈনের কোথাও কোথাও হাঁটু জলের দেখা পাওয়া বেশ মুশকিল হয়ে যায়। তারপরও বছরে জুড়েই নৌকা চলাচল করে। তবে তৈন খালের গঠন ও চলার পথের ধরণের জন্য নৌকা কেবল দুসরী বাজার পর্যন্তই যাতায়াত করতে পারে। সে বর্ষায় হউক আর শুকনো মৌসুমে। আষাঢ় থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত নৌকায় দুসরী বাজার যাতায়াত বেশ সাবলীল। তারপর থেকেই বিশেষ কায়দা করে নৌকা চালাতে হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা এ ব্যাপারে বেশ পটু।
সারাবছর জল ধরে রাখার জন্য তাঁরা খালের বেশ কিছু জায়গায় গোদা তৈরি করে। গোদা হচ্ছে বাঁশ দিয়ে তৈরি এক ধরণের অস্থায়ী বাঁধ। গোদার মাঝ বরাবর একটি ফটক থাকে। যেটি খুলে দিলেই জল বেরিয়ে আসে। বাঁশ দিয়ে সাধারণত স্রোতের বিপরীতে ৪৫ ডিগ্রি হেলিয়ে তৈরি হয় বাঁধটি। এতে পানি চলাচলে প্রাথমিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। কিন্তু বাঁশের ফাঁক গলে কিছু জল বের হয়ে আসে যার জন্য খালের ভাটিতে কখনই জলের অভাব হয় না এবং বাঁধের উজানেও বেশ জল জমে থাকে। জলের প্রবাহটিকে যখন কাজে লাগাতে হয় তখন গোদার ফটক খুলে দিলেই জল প্রবাহের মাত্রা বেড়ে যায় এবং তখন সেই জল প্রবাহকে ব্যবহার করে সহজেই নৌ যাতায়াত করা যায়। মূলত শুকনো মৌসুমে খালের উজান হতে বিভিন্ন দ্রব্যাদি বহনের জন্য এই পদ্ধতিটির ব্যবহার করা হয়। হাল সময়ে এভাবে চুরাই কাঠ এ পথে চলে আসছে।

তৈন খালের মূল আকর্ষণ দুসরী বাজারের পর থেকে। সমস্ত পথ জুড়েই ছোট বড় পাথরের বোল্ডার। যতই উজানের দিকে যাওয়া যাবে এই বোল্ডারের গোলকধাঁধাও বাড়তে থাকবে। খালের পূর্ব দিকে বান্দরবান পর্বতসারি আর পশ্চিম দিকে অপেক্ষাকৃত অনুচ্চ পর্বতসারি। তৈন খালের বিশেষ একটি দিক হচ্ছে তার চলার পথে সে ধাপে ধাপে নিচের দিকে নেমে এসেছে। বিষয়টা খালি চোখে ধরা পরে না। কারণ পাহাড়ি খাল বা নদীর এটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। তৈন খালের ক্ষেত্রে প্রায় কিলোমিটার পর পরই কুম এর দেখা মেলে। (কুম এক ধরণের জলপ্রপাত। তবে এর উচ্চতা হয় কম। সাধারণত নদী বা খালের আপার কোর্সে অপেক্ষাকৃত উচ্চস্থান হতে পাথরের ফাটল দিয়ে নিম্নতম স্থানে নেমে আসার পথ। যার পতন স্থলে গভীর জলাশয়ের তৈরি করে।) এর কোন কোনটা খুব একটা উচ্চ নয় তবে ভাল ভাবে খেয়াল করলে বিষয়টি উপলব্দি করা যায়। তৈন খাল উৎস থেকে মিলনস্থল পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে। এই পথচলায় খালটি সর্পিল পথে পাহাড়ের ফাঁক গলে দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে বয়ে চলেছে। দুসরী বাজারের কাছে এসে বাঁক নিয়ে পশ্চিমে মাতামুহুরীর দিকে ছুটে চলে।

উৎসমূখে পূর্ব দিক থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটারের মতো পশ্চিম দিকে নেমে এসে উত্তর দিকে বাঁক নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে। অন্যান্য নদী বা খালের মতোই তৈন খালের অনেকগুলো জলদানকারী (ট্রিবিউটারি) রয়েছে। যার কোন কোনটি বেশ প্রসিদ্ধ। তৈন খালটি বান্দরবান পর্বতসারির পশ্চিমে প্রায় গা ঘেসেই চলেছে। খালটির পশ্চিম দিকে বান্দরবান পর্বতসারির একটি সাবসিডিয়ারি পর্বতসারি। যার গড় উচ্চতা আনুমানিক ৮০০ ফুট। এই দুই পর্বতসারি হতে অসংখ্য ঝিরি ও ছড়া নেমে এসে মিলেছে তৈনে। যার ফলে বেশ কিছু ঝর্না সরাসরি তৈন খালে ঝাপিয়ে পরেছে। যেগুলো পূর্ব ও পশ্চিম হতে স্বতন্ত্র জলধারা হিসেবেই প্রবাহিত হয়ে তৈন খালে মিশেছে। তৈন খাল নিজে কখনই ঝর্না হয়ে ঝাপিয়ে পরেনি। এমনকি উৎসেও উল্লেখযোগ্য কোন ঝর্না নেই। যে সকল ঝর্না ও জলপ্রপাত তৈনকে জল দিয়ে সমৃদ্ধ করেছে তাদের ভিতর প্রসিদ্ধ হচ্ছে থানকুয়াইন, চাইম্প্রা, পালংখিয়াং, লাদমেরাগ ইত্যাদি। এছাড়াও তৈন খালের অনেক জলদানকারী (ট্রিবিউটারি) রয়েছে।
তৈন খালকে জলদানকারী প্রধানতম ঝিরিগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। এক – পূর্ব দিক হতে বান্দরবান পর্বতসারি হতে জন্ম নিয়ে তৈন খালে পড়েছে। দুই – পশ্চীম দিকের অনুচ্চ পর্বতসারি থেকে যে ঝিরিগুলো তৈন খালে মিশেছে।
পাড়া ও মিলনস্থান অনুযায়ী ঝিরিগুলো :
আমরা তৈনের পতন স্থান থেকে উজানে উৎসের দিকে হাতের ডান ও বাম এভাবে ঝিরিগুলোর অবস্থা চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছি।
হরিণ ঝিরি : আমতলী ঘাট হতে অল্প দূরে হাতের বামে উত্তর দিকে থেকে এসে মিশেছে তৈন খালে। এ ঝিরি ধরে কালিয়া ছড়া যাওয়ার রাস্তা আছে।
ডলু ঝিরি-১ : ক্রাংচি মুরং পাড়ার কাছাকাছি ডান পার্শ্ব হতে তৈন খালে মিশেছে ।
রেইস্যা ঝিরি : পাইয়্যা পাড়ার কাছ দিয়ে ডান দিক হতে তৈন খালে পরেছে। এই ঝিরিটিকে রেইম ব্রুক ঝিরিও বলে। এটি ধরে উজানে রেইম ব্রুক পাড়া যাবার রাস্তা আছে। তবে স্বতন্ত্র আর একটি ঝিরিও রেইম ব্রুক নামে পরিচিত এবং ঝিরিটি মাতামূহুরীতে মিলেছে।
সেইং ঝিরি : পাইয়্যা পাড়ার পরে হাতের বামে তৈন খালে মিশেছে।
দুসরী ঝিরি : দুসরী বাজারের কাছে ঝিরিটি বাম পার্শ্ব হতে মিশেছে তৈন খালে। এ ঝিরি ধরে উজানে চলে গেলে আলীকদম থানচি সড়কের ১৩ কিলো’তে পৌঁছা যায়।
উইতাল ঝিরি: বরুইথলী পাড়ার কাছাকাছি এ ঝিরিটির অবস্থান। ঝিরিটি বাম হতে এসে মিশেছে তৈনখালে। এ ঝিরি ধরে উপরে উইসিংদা পাড়া যাওয়া যায়।
থানকুয়াইন বা তানকুইয়্যান: চমৎকার একটি ঝর্না আছে এই ঝিরিটিতে। ঝর্নার পতন স্থলটিই তৈন খালে মিশেছে। হাতের ডান পার্শ্ব হতে এসে মিশেছে তৈন খালে।
কাঁকড়া ঝিরি: ডান হতে পাহাড় থেকে নেমে এসেছে ঝিরিটি। তৈন খালের এ জায়গাটি মাছ ও কাঁকড়া ধরার জন্য প্রসিদ্ধ। স্থানীয়রা ক্যাকড়া ঘাট বলে যায়গাটিকে।
কাঁঠাল ঝিরি বা কাতল ঝিরি: নিলমনী তঞ্চগ্যা পাড়া হয়ে এই ঝিরিটি বাম পার্শ্বে এসে মিশেছে তৈন খালে। চমৎকার সুন্দর একটি ঝিরি। অসংখ্য ছোট বড় পাথরে ঢাকা এই ঝিরিটিও মনোমুগ্ধকর। স্থানীয়রা কাঁটাল ঝিরি, কাঠাঁল ঝিরি আবার কেউ কেউ কাতল ঝিরি নামে ডেকে থাকে।
চাইম্প্রা ঝিরি-১ : হাতের বাম পার্শ্বে মিশেছে। এ ঝিরির উজানে বেশ কটি সুন্দর ঝর্না রয়েছে। সম্ভবত ক্রিস তং থেকে এর জন্ম। আমরা অনেকে একে সাইন প্রা বলে উচ্চারণ করে থাকি।
ভাল্লুক ঝিরি: পূর্ব দিকের রেইম ব্রুক পাড়া হয়ে এই ঝিরিটি হাতের ডান দিক হতে তৈন খালে পরেছে। এক সময় ভল্লুক এর বিচরণ ছিল এ ঝিরিতে।
পালংখিয়াং ঝিরি : অসাধারণ একটি ক্যাসকেড আছে এ ঝিরিতে। ক্যাসকেডটি সরাসরি তৈন খালে মিশেছে বাম পাশে।
বাঘাই ঝিরি : এ ঝিরির উজানে একটি ছোট ঝর্না আছে। ঝিরিটি ডান পার্শ্বে মিশেছে।
লাদমেরাগ : সুউচ্চ একটি ঝর্না সরাসরি লাফিয়ে পরেছে তৈন খালে। এই ঝর্নাটিই লাদমেরাগ ঝিরি। হাতের ডান পার্শ্বে মিশেছে তৈন খালে।

উইপাং ঝিরি : এই ঝিরির উপরের দিকে মেল্লু পাড়া। ঝিরিটি বাম হতে তৈন খালে পরেছে।
ছোট আম ঝিরি : ডান পার্শ্ব হতে তৈন খালে মিশেছে। ঝিরিটির উজানে সুন্দর একটি ঝর্না আছে।
পুংকাং ঝিরি : জনাচন্দ্র পাড়ার কাছে সেগুন বাগানের পাশ দিয়ে হাতের বাম হতে ঝিরিটি তৈন খালে পরেছে।
বড় আমঝিরি : রালাই পাড়ার কিছুটা আগে হাতের ডান পাশে সুন্দর একটি ঝর্না তৈরি করে ঝিরিটি আরও কিছুটা সামনে এগিয়ে তৈন খালে মিশেছে।
ডলু-২ ঝিরি : ডান পাশ হতে তৈন খালে পরেছে।
চাইম্প্রা-২ : ইয়ংঝা ও মাংরুম পাড়ার কাছে হাতের বামে তৈন খালে পরেছে এই ঝিরিটি। অন্য নাম সংগ্রহ করা যায়নি। একই নামে বিখ্যাত আরেকটি ঝিরি থাকায় একে চাইম্প্রা-২ হিসেবে চিহ্নিত করেছি।
লিচু ঝিরি : খিদু পাড়ার কাছে হাতের ডান হতে তৈন খালে মিশেছে এই ঝিরিটি। বেশ বৈচিত্রময় ঝিরিটি এখনও কিছুটা বন্য। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে এখনও হরিণ বিচরণ করে এ ঝিরিতে। অনেকে লেছু ঝিরি নামেও ডাকে এই ঝিরিটিকে।
পাইয়্যা ঝিরি : খিদু পাড়ার পরে হাতের ডান হতে তৈন খালে পরেছে ঝিরিটি। এই ঝিরিটি একটি লিংক রোড হিসেবে কাজ করে। যা ধরে মাতামুহুরী সংরক্ষিত বনের ঝিরিগুলোতে চলে যাবার রাস্তা আছে।
এছাড়াও আরও অনেক ছোট-বড় ঝিরি আছে যেগুলোর কোন কোনটির সুনিদির্ষ্ট নাম নেই এবং কিছু কিছুর নাম সংগ্রহ করা যায় নি। একই নামে একাধিক ঝিরির দেখা পেয়েছি। স্থানীয় উচ্চারণ ও তথ্য যাচাইয়ের যথেষ্ট উৎস না থাকায় ভিন্ন নাম সংগ্রহ করা যায় নি। তাই সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত করেছি একই নামের ঝিরিগুলোকে ।

এবার চলে যাই তৈন খালের উৎস সন্ধানের গল্পে :
তৈন খালের উৎস দেখার লোভে অনেকটা পথ চলেছি। কাজটা বেশ কঠিন ছিল। ঋতু বৈচিত্র্যের কারণে আমাদের দেশের নদীগুলো সময়ভেদে রূপ পাল্টায়। তাই বর্ষায় এবং শুকনো দুই মৌসুমেই কখনও খালধরে আবার পাহাড়ধরে দু’ভাবেই চলতে হয়েছে। প্রথমে খালধরেই চলেছি। রালাইপাড়াকে বেজক্যাম্প ধরে নিয়ে অভিযানটি শুরু করি। প্রথম ভাগে ছিল, খালধরেই যাবো উৎস পর্যন্ত এবং সেভাবেই রাত-দিন হেঁটে আমাদের বেজক্যাম্প এর কাছাকাছি জনাচন্দ্র পাড়াতে রাত্রিযাপন করি। রালাইপাড়ার পর খাল ধরে যেতে পারলে খুব অল্প সময়েই উৎসের কাছে আমাদের নির্বাচিত বেজক্যাম্প এ পৌঁছা যেতো। কিন্তু রাস্তা থাকা সত্বেও আমাদের কিছুটা ঘুরে পাহাড়ি পথ ধরে চলতে হয়েছে আর উপর থেকে তৈন খালটিকে অনুসরণ করতে হয়েছে। এরজন্য তৈনকে পাখির চোখে কেমন লাগে তার একটা চিত্র পেয়ে যাই। মূলত রালাইপাড়া থেকে পশ্চিম দিকের খাড়া পাহাড় অতিক্রম করে কিছুটা পথ চলার পর রির্জাভ পাহাড়ের সারি। এই পাহাড়ের প্রায় ৯০ ডিগ্রি খাড়া পাথুরে ঢাল বেয়ে উপরে উঠে যেতে হয়। তারপর পাহাড়ের পিঠ ধরে সোজা দক্ষিণ দিকে। এই পাহাড় সারির শেষ দিকেই আছে রিংলট হুট পাহাড়, আমরা কালা পাহাড় নামে চিনি।
যা হোক ইয়ংঝা পাড়া ক্যাম্প হতে খিদু পাড়া পর্যন্ত তৈনখালে তেমন কোন বৈচিত্র নেই। ছোট ছোট পাথুরে বোল্ডার আর পথটা মোটামোটি সরল। তবে এ জায়গায় বেশ কিছু ছোট ছড়া তৈন খালে মিশেছে যাদের নাম সংগ্রহ করা যায় নি। এ পথে হাঁটতে থাকলে মনে হবে উৎসে তৈন কতটা দীন। হাতের ডানে লিচু ঝিরি রেখে অল্প এগিয়ে গেলেই খিদু পাড়া। তৈন খাল হাঁসুলির মতো পাড়াটাকে জড়িয়ে আছে । অসাধারণ সুন্দর পাহাড়ি গ্রাম খিদু। এটা আমাদের ২য় বেজ ক্যাম্প। বিশ্রাম নিয়ে আমরা উৎসের খুঁজে বের হয়ে যাই। পাড়া থেকে দক্ষিণ দিকে অল্প চলার পর দেখা মিলে পাইয়্যা ঝিরির। ঝিরিটিকে হাতের ডানে রেখে সোজা চলতে থাকলেই তৈন খালের লুকনো সৌন্দর্য ঘোমটা খুলে ধীরে ধীরে রূপ মেলে ধরবে। তখন বুঝা যায় তৈন উৎসে দীন নয়, এ তার অবগুন্ঠন করে রাখা হেঁয়ালি। এখান থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার পূর্ব দিকের বান্দরবান পর্বতসারি হতেই তার জন্ম। কখনও কখনও বোল্ডারগুলো বেশ বাঁধার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্থানীয়রা গাছ ও বাঁশ দিয়ে মইয়ের মতো তৈরি করে দিয়েছে। যা দিয়ে বোল্ডারের উপরে উঠে অপর দিকে বাঁশের সাঁকো দিয়ে এক বোল্ডার থেকে আরেক বোল্ডারে, এভাবে চলতে হবে। যতই সামনে যাই পাথুরে বোল্ডারের এই খেলার নানা সুডকো মেলাতে মেলাতে চলতে থাকি। কখনও দুই পাহাড়ের মাঝ দিয়ে অন্ধকার সুড়ঙ্গের মতো গিরিখাতের ভিতর দিয়ে জল ভেঙ্গে গা ছমছম করা পথে চলতে হয়।
তবে সাবধান, এ পথে হাত ও পা দেখেশুনে ফেলতে হবে। পাথরের উপরে, খাঁজে শুকনো পাতার ফাঁকে ঘাপটি মেরে থাকে সাপ। এ ধরণের তিনটি গিরিসংকট পার হয়ে এগিয়ে গেলে পাথরের পথটা ডানবাম করে একটা জায়গায় হারিয়ে যায়। সেখান থেকে তৈন এর খুঁজ করা কষ্টকর। মূলত এরপর অনুচ্চ পাহাড় আর তারপর চিম্বুক রেঞ্জের মুনাহা ত্লাং ও পি৪-০৯ পর্বতের মাঝ হতেই এর জন্ম। স্থায়নীদের কেউ আর ঐ দিকে যেতে চায় না আর তেমন কোন চিহ্ন নেই। এদিকে সন্ধ্যার অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে চারিদিক। তারপরও আমরা সামনে যাবো বলে পা বাড়াই। আকাশে শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদ। জোছনায় চন্দ্রগ্রস্ত তিন মানব সন্তান আমি, বুনো আর জগৎ চন্দ্র ত্রিপুরা সেই অনুচ্চ পাহাড়টায় উঠি। কিন্তু আমাদের সামনে কেবলি চিম্বুক রেঞ্জের বিশাল পর্বতসারি। চাঁদের আলোয় দেখে নেই সেই ঘন জঙ্গল ঘেরা পর্বত খাঁজটাকে। এখানেই জন্ম তৈন খালের। এখনও বড় বড় গাছ আর বেশ ঝোপ জঙ্গল আছে তবে জুমের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে তাই অচিরেই এই দৃশ্য পাল্টে যাবে।

জীববৈচিত্র :
তৈন খালে সারা বছরই মাছ পাওয়া যায়। মহাশোল, বোয়াল, নাটিং, পুঁটি, বাইম, চিংড়িসহ আরও অনেক ছোট ছোট বিভিন্ন জাতের মাছের দেখা পেয়েছি। ছোট একধরণের মাছ আছে, রূপালি শরীরে গাঢ় নীল রঙের ডোরাকাটা । মাছগুলো ঝাঁক বেঁধে পানির উপরে লাফিয়ে চলে। মাছের সেই নৃত্য বর্ননার অতিত। আরও একটি দৃশ্যের কথা ভুলার নয়, শীতের ভোরে যখন কোয়াশায় ঢাকা থাকে খালের উপরের অংশ তখন ছোট ছোট কিছু মাছ বিচ্ছিন্ন ভাবে লাফাতে থাকে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে বৃষ্টির ফোটা পরছে জলে। রোদ উঠার আগ পর্যন্ত এই লাফালাফি অবিরাম চলতেই থাকে। এই দৃশ্য দেখতে হলে অপেক্ষাকৃত নির্জন স্থানে তাঁবুতে রাত্রিবাস করাই উত্তম।

ব্যাংঙ, শামুক ও কাঁকড়াও আছে। বর্ষায় জাল দিয়ে, বাঁশের তৈরি ফাঁদ দিয়ে মাছ শিকার করা হয়। শুকনো মৌসুমে বাঁধ দিয়ে জল সেচে মাছ ধরার চিত্রও দেখতে পেয়েছি। স্থানীয় মানুষেরা সুসু দিয়ে রাত জেগে মাছ ধরেন। ত্রিপুরা ভাষায় সুসু হচ্ছে কোচের (টেটা) মত মাছ ধরার একটি কল। এছাড়াও তৈনখালের বিশেষ কিছু যায়গা আছে যেখানে বেশ ভাল মাছ পাওয়া যায়, বিশেষত মহাশোল। স্থানীয় ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী এরকম একটি জায়গাকে মাছকুম বলে। পরবর্তীতে একাধিক মাছকুমের সন্ধান পেয়েছি। তৈনখালের মোহনীয় ও বেশ বৈচিত্রময় এই জায়গাটি। পাথরের বিচিত্র গঠন আর বিন্যাস সেই সাথে তৈনের জলে ক্ষয়ে গিয়ে অসাধারণ সব কারুকাজের চিত্র দু’পাশের পাহাড়গাত্রে। তিনটি ধাপে যায়গাটি বিস্তৃত। মূলকুমের উপরে সারিবদ্ধ গোলাকার পাথরগুলো দেখলে মনে হবে কেউ হয়তো মাপুনিকাঠি (স্কেল) দিয়ে সরল রেখায় বসিয়ে দিয়েছে। বর্ষায় এ যায়গাটির বেশির ভাগ অংশই পানির নিচে থাকায় এতটা সৌন্দর্য বুঝা যায় না। মূল কুমের নিচের অংশে একটা পুকুরের মতো তৈরি হয়েছে আর মাছ শিকারের জন্য এটাই শ্রেষ্ঠ জায়গা। আরও একটি জায়গা মাছকুম হিসেবে পরিচিত সেটিও চমৎকার। রুংরাং থেকে নেমে আসা কাতল ঝিরি যেখানে মিশেছে তার থেকে কিছুটা উজানে। জায়গাটি বর্ষায় দুর্গম। অসাধারণ পাথরের করুকাজ। সারা বছরই এর কিছু কিছু জায়গা এতটাই গভীর থাকে যার জন্যই খাল ধরে চলাচল করা যায় না। তবে মাছের জন্য শিকারীরা এই ঝুঁকি হরহামেশাই নিয়ে থাকে।
তৈনখালের দুই পাড়ের পাহাড়ে এখনও বানর দেখতে পাওয়া যায়। আমরা বানরের এরকম ৫/৬ পরিবারের দেখা পেয়েছি। গঙ্গাফড়িং ও নানা বর্ণের প্রজাপতির দেখা পাওয়া যায়। পুরো পথ জুড়েই নানা ধরণের পাখির সাথে দেখা হবে। লাটোরা, বুলবুলি, ফুটকি খঞ্জন, সবুজ টিয়া, ময়না, মাছরাঙা, রাতচোরা আরও অনেক জাতের পাখির দেখা পেয়েছি। এক সময় ধনেশ পাখির দেখা পাওয়া যেত এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব:
স্থানীয় ত্রিপুরা, মুরং ও তঞ্চগ্যা জনগোষ্ঠির সকলের জীবনের সাথে তৈন জড়িয়ে আছে। জুমের ফসল, বাঁশ, কাঠ এবং পাহাড় হতে আহরিত নানা সবজি ও ফল পরিবহনের একমাত্র সাশ্রয়ী পথ হচ্ছে তৈন খাল। তবে পরিতাপের বিষয় হচেছ আলীকদম সদর হতে দুসরী পর্যন্ত তামাক চাষের জন্য পরিবেশগত মারাত্মক ঝুঁকিতে আছে তৈন খাল ও এর তীরবর্তী বাসিন্দারা। নিজেরাও জানেন না কি বড় রকমের বিপদ ঘনিয়ে আসছে ।
পরিবেশ বিপর্যয় যেন তৈনকে গ্রাস করতে না পারে এই প্রার্থনাই করি। তৈনের উৎস থেকে দক্ষিণ দিকে সীমান্ত পর্যন্ত মাতামুহুরী সংরক্ষিত বন। পাইয়্যা ঝিরি ও লিচু ঝিরির জলের উৎস এই বনের বৃহৎ গাছগুলো। গাছগুলো বিন্দু বিন্দু জল দান করে গড়ে তুলেছে বিশাল জল ব্যবস্থাপনা। আর এই দুটি ঝিরিসহ উৎসের কাছে আরও একটি ঝিরিই বিপুল জলের জোগান দেয় তৈনকে। পরিতাপের বিষয় সংরক্ষিত বনে অবাদে জুম চাষ আর বড় বড় গাছ কাটার জন্য বন যেমন হুমকীর মুখে তেমনি ঝিরিগুলোও ঝুঁকির মধ্যে আছে। গাছ না থাকলে ঝর্না, ঝিরি, খাল, নদী, জীববৈচিত্র কিছুই থাকবে না। বন বাঁচলে বাচঁবে পানি। বেঁচে থাকুক তৈন আমাদের রূপসী বাংলায়।
(লেখাটি পার্বত্য নিউজের মার্চ ২০১৯ সংখ্যায় প্রকাশিত)
ছবি : লেখক, বুনো।